ইত্যাদি’ এবং হানিফ সংকেত

ইত্যাদি’ এবং হানিফ সংকেত

বিনোদন ডেস্ক : ইত্যাদি’ ছাড়াও ব্যক্তি হানিফ সংকেত আমজনতার কাছে পরম আস্থার একটি নাম। তবে এ মানুষটিকে ছাড়া ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটির একটি দৃশ্যও কল্পনা করা মুশকিল। হয়তো অনেক দৃশ্যেই সশরীরে হানিফ সংকেত থাকেন না, কিন্তু নিয়মিত দর্শক ভালো করেই জানে, দৃশ্যটার নেপথ্যে আছে একটা পরিণত মস্তিষ্ক। সেই মস্তিষ্ক থেকেই বের হয় ছন্দোময় সব সংলাপ, আইডিয়া, গানের কথা, ভয়েস ওভার। দর্শক যতক্ষণ ‘ইত্যাদি’ দেখে, আদতে ততক্ষণ তারা হানিফ সংকেতকেই দেখে। এ কারণেই ‘ইত্যাদি’ আর হানিফ সংকেত একে অন্যের পরিপূরক। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের টিভিতে কত ধরনের অনুষ্ঠান এল-গেল, ‘ইত্যাদি’ ঠিকই রয়ে গেল।

১৯৮৯ সালের মার্চে প্রচারিত হয় ‘ইত্যাদি’র প্রথম পর্ব। শুরুর দিকে প্রচারিত হতো মাসে দুইবার। বিটিভির প্যাকেজ যুগের প্রথম প্যাকেজ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানও ‘ইত্যাদি’। ৩২ বছরে কত কিছুর বদল হলো—বিটিভি দর্শক হারাল, স্যাটেলাইট যুগ এলো, এলো ইউটিউব-ওটিটির যুগ। মুঠোফোনের কল্যাণে হাতের মুঠোয় বিনোদন দুনিয়া নিয়ে বসে আছে দর্শক, তবু ‘ইত্যাদি’র আবেদন এতটুকু কমেনি তাদের কাছে। অনেকে হয়তো ‘ইত্যাদি’র জন্যই তিন মাসে একবার চ্যানেল লিস্ট থেকে খুঁজে বের করে বিটিভি। পাশের বাড়ি থেকে ‘কেউ কেউ অবিরাম চুপি চুপি’র সুর কানে ভেসে এলে সংবিৎ ফিরে পেয়ে টিভি সেটের সামনে জড়ো হয় কেউ কেউ।

২০১৪ সালের মে মাসে ‘ইত্যাদি’র ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে ‘রঙের মেলা’। শিরোনাম—‘বোকাবাক্সে তিনিই বিবেক’। সমাজের বিভিন্ন অসংগতি আর অনিয়মের বিরুদ্ধে যিনি নিরলসভাবে দাঁড়িয়ে যান, তিনি তো বিবেকই। সরকারি প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে সব বিষয়ে সব সময় বলা যায় না। তার জন্য বুকে শক্ত পাটা থাকা চাই। সেটা হানিফ সংকেতের আছে, সঙ্গে আছে সৃজনশীলতা। কতটুকু বলতে হয়, কোথায় থামতে হয় এবং কিভাবে বলতে হয়, সেই দক্ষতা আছে বলেই তিনি গ্রহণযোগ্য বিবেক। লোকে ‘ইত্যাদি’ পছন্দ করে মূলত এ কারণেই। সমাজে অসংগতি আর অনিয়ম যত দিন থাকবে, হাস্যরসের মাধ্যমে সেসব চোখে আঙুল দিয়ে ধরিয়ে দিতে ‘ইত্যাদি’ও থাকবে তত দিন।

নানা-নাতি, মামা-ভাগ্নে বা নানি-নাতি সেগমেন্ট ছাড়াও প্রতি পর্বেই থাকে সরস ও তীক্ষ নাট্যাংশ। থাকে নতুন, পুরনো ও বিষয়ভিত্তিক প্যারোডি গান। বিদেশি সিনেমার দৃশ্যের সঙ্গে হানিফ সংকেতের মজাদার সংলাপের ভক্ত অনেকেই। বিনোদনের মোড়কেই ‘ইত্যাদি’তে থাকে তথ্য ও শিক্ষার নানা উপকরণ। শুধু আনন্দ-বিনোদনই নয়, মানুষের কল্যাণে যাঁরা কাজ করেন, তেমন মানুষকে খুঁজে বের করে অনুষ্ঠানে সম্মানিত করেন হানিফ সংকেত।

‘ইত্যাদি’র অর্জনের তালিকা অল্প কথায় লিখে শেষ হবে না। নিবেদিতপ্রাণ মানুষের সন্ধানে সারা দেশে ছুটে বেড়ান হানিফ সংকেত। প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রচারবিমুখ আলোকিত মানুষকে তিনি তুলে এনেছেন বরাবরই, যাঁদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মান।

বিশুদ্ধ পানি ও পয়োনিষ্কাশন, পানির অপচয় রোধ, গ্যাসের অপব্যবহার রোধ, বৃক্ষরোপণ, শিক্ষা, পরিবেশদূষণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ, শিশুশ্রম, শিশুদের খেলার মাঠ, প্রতিবন্ধীদের ওপর প্রতিবেদন, অসুস্থ শিল্পী ও মানুষকে নিয়ে মানবিক প্রতিবেদন থাকে প্রায় প্রতি পর্বেই। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল নিরোধকল্পে প্রথম মোবাইল কোর্ট চালু হয়েছিল ‘ইত্যাদি’র উদ্যোগেই। গণপরিবহনের পেছনে লেখা কুরুচিপূর্ণ অশোভন স্লোগান হটিয়ে শিক্ষামূলক স্লোগান লেখার রীতি শুরু হয়েছে ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে। এমন উদাহরণ আছে শতাধিক।

পলান সরকারের মাধ্যমে দেশের গ্রামেগঞ্জে বই পড়ার আন্দোলন, দেশে প্রথম পরিবেশ পদকপ্রাপ্ত গহের আলীর মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ আন্দোলন কিংবা কয়েক শ কৃষক সন্তানকে নিয়ে পরিচালিত গ্রিন সেভার্সের ছাদকৃষি কার্যক্রম তুলে ধরেছেন, যাঁদের উদ্যোগে কয়েক হাজার ছাদবাগান হয়েছে ঢাকা শহরেই।

‘ইত্যাদি’র আর্থিক সহায়তায় গড়ে উঠেছে অনেক স্কুল ও কলেজ। পারুল আপার ফ্রি পাঠশালা, ফরিদপুরের এবিসিকে কলেজ, উত্তর অরণখোলা ডিজিটাল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হয়।

সংস্কৃতি অঙ্গনের বিভিন্ন শাখায় অবদান রেখেছে ‘ইত্যাদি’। তুলে এনেছে দারুণ সব প্রতিভা। কণ্ঠশিল্পী মমতাজকে টিভির পর্দায় দর্শকের সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন হানিফ সংকেত। সেই মমতাজ পরে ফোকসম্রাজ্ঞীর খেতাব পেয়েছেন, হয়েছেন সংসদ সদস্যও। এভাবে আকবর, নাফিস কামাল, অর্জুন কুমার বিশ্বাস, পথিক নবী, ওয়াকীল, প্রীতম হাসান, প্রতীক হাসান, সান্টু, নকুল কুমার বিশ্বাস, পান্থ কানাই, কানিজ সুবর্ণাসহ সংগীতের আরো অনেকের নামই নেওয়া যায়।

একইভাবে অনেক অভিনয়শিল্পীর টিভির পর্দায় আত্মপ্রকাশ ‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত গানের মডেল হয়ে। তালিকায় আছেন সুমাইয়া শিমু, রোমানা, মীর সাব্বির, চাঁদনী, নাদিয়া, ফারজানা ছবি, জয়রাজসহ অনেকেই।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে ‘ইত্যাদি’ও। স্টুডিওর চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে নেমেছে শিকড়ের সন্ধানে। বেশ কয়েক বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী সব জায়গায় হচ্ছে পর্ব ধারণ। তুলে ধরা হচ্ছে সেসব স্থানের গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য।

‘ইত্যাদি’র বাইরে হানিফ সংকেত একজন জনপ্রিয় রম্য লেখক। প্রতিবছর ঈদে টেলিভিশনের জন্য বানান নাটক। সেখানেও তিনি তুলে ধরেন সমাজের নানা অসংগতি। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘আমাদের লোক’। সাধারণত জনপ্রিয় মানুষের শুভাকাঙ্ক্ষীর পাশাপাশি নিন্দুকও থাকে, কিন্তু হানিফ সংকেত এই দেশে একমাত্র ব্যতিক্রম, ‘ইত্যাদি’র মতো তাঁরও কোনো নিন্দুক নেই।
সিলেট প্রতিদিন /টিআই