চারটি  বছর পরীক্ষা না হওয়ার দায়িত্ব কার?

চারটি  বছর পরীক্ষা না হওয়ার দায়িত্ব কার?

নাহিদ সুলতানা বিথী :: অনেকদিন তারা আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল কিন্তু করোনার  কারণে দেখা করা সম্ভব হবে  না বলেছিলাম ।  গতকাল বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ফুলেল অভিনন্দন গ্রহণ করার জন্য নেতাকর্মীদের সময় দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর আমাকে নিচে যেতে হয়েছিল, কারণ বাংলাদেশের শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা আমার বাড়ির সামনে ভিড় জমিয়েছিল।

সেই দুপুর থেকে রাত নটা অবধি তারা অপেক্ষা করছিল  বাড়ির দরজায়  । এর মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের বেশ কয়েকজনও 
ছিল।  আমি নিচে যেতেই জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু শ্লোগান এ  প্রকম্পিত হতে শুরু করল, তাদের কাছে জানতে পারলাম চার বছরে প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষানবিশ জমেছে, অপেক্ষা করছে, আইনজীবীর সনদের। তারা এসে  মাটিতে বসে গেল। আমার খুব খারাপ লাগছিল ,লজ্জা লাগছিল যে, এত বড় বড় মানুষগুলো মেঝেতে বসে হাত জোড় করে থাকলো। 

আমি তাদের বললাম, আপনারা আমাদের সঙ্গে আইনজীবী হবেন আপনারা কেন হাতজোড় করে মেঝেতে বসে থাকবেন, আপনাদেরকে এমন ভাবে দেখতে আমার ভালো লাগেনা। চার-পাঁচজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালেন  তাদের বক্তব্য,  ভয় পাচ্ছে এরপর তারা পরীক্ষায় বসবে তারপর তাদেরকে ফেল করানো হবে, তারপরে তারা অপেক্ষা করতে থাকবে, তাহলে তাদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত।

মোটকথা  উনারা বার কাউন্সিল এর সিদ্ধান্তকে  বিশ্বাস করছে না। আমি বার কাউন্সিলের নীতিনির্ধারক কেউ না, একজন সাধারন আইনজীবী,  আমার বলার কিবা থাকে  শুধু এই টুকুই বলেছি  যে আপনারা অপেক্ষা করেন, কিন্তু তারা অবস্থান নিয়েছিল কিছুতেই এখান থেকে যাবে না, তাদের ধারনা আমরা বললেই তারা জেনো হয়ে যাবে আইনজীবী। উপরে চলে আসলাম, কতক্ষণে ওরা চলে গিয়েছিল জানিনা তবে নিজের কাছে খুবই খারাপ লাগছিল খুব কষ্ট হচ্ছিল ওদের কান্না জড়িত নতজানু করোজোর  দেখে। আমি বুঝলাম না চার চারটি বছর কেন পরীক্ষা হলো না, আমি জানি না এর দায়িত্ব কার, পরীক্ষার হল পাওয়া যায়নি এই অজুহাত আমি অন্তত মানতে রাজি নই। 

আমরা যখন নির্বাচিত হই তখন আমরা কিছু কাজ করার জন্যই নির্বাচিত হই  । আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর কাজের তফসিল ঘোষণা করেই নির্বাচন হয়েছিলেন।  জনগণ দেখে তাদের কতটা উপকার আসবে সরকার, সেই অনুসারে ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের কাজের ম্যান্ডেট দেয় সরকার কে হবে।জননেত্রী শেখ হাসিনার কাজের মূল্যায়ন স্বরূপ বাংলাদেশে  তিনি তিনবার টানা নির্বাচিত হয় কাজ করে যাচ্ছেন, অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বাংলাদেশ বিনির্মাণে।  

বড় আকারের সরকার গঠন  আর ছোট পরিসরের বিভিন্ন নির্বাচনের অর্থ একই। আমার কিছুই বলার নাই শুধু কতগুলো মুখ চোখের সামনে ভাসছে যারা  মেঝেতে বসে ছিল তাদের দেখে আমার মনে হয়েছিল এনাদের তো আমাদের সাথে প্র্যাকটিস করার কথা ছিল, কোর্টে যাওয়ার কথা ছিল, আইনজীবী হওয়ার কথা ছিল। 

৪ টি বছর পরীক্ষা না হওয়ার দায়িত্ব কার? করোনাকালীন সময়ে সরকার   অনেক গুলো পরীক্ষা নেয় নি। ৭২ সালের মতো অটো প্রমোশন হয়েছে অনেক, হতে যাচ্ছে আরো।  পরিশেষে আমি বলতে  চাচ্ছি, গতকাল রাত থেকে আজ পর্যন্ত একটিবারও আমি স্বস্তি পাচ্ছি না, বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে হয়তো কষ্ট পাচ্ছি। আমাদের কি কিছুই করার থাকেনা, আমরা কি মায়া মমতার ঊর্ধ্বে? আমরা কি আইন কে মান্য করি আইনের প্রয়োজনে  নাকি আমাদের প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন হয়েছে। 

পরিশেষে এটুকুই বলতে পারি শিক্ষানবিস রা ভালো থাকুন , মাথা উঁচু করে আইনজীবী হন, নতজানু হওয়ার কিছু নাই। আপনারা আমাদের আগামী দিনের যোগ্য উত্তরসূরী।কবিগুরু রবি ঠাকুরের প্রশ্ন কবিতাটির শেষের কয়েকটি লাইন বারবার মনে হচ্ছে ---কন্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা, অমাবস্যার কারা, লুপ্ত করেছ আমার ভুবন দুঃস্বপ্নের তলে, তাইতো তোমায় শুধাই অশ্রু জলে- যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছো, তুমি কি বেসেছ ভালো।

লেখক : আইনজীবি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।