বেসামাল হেফাজত ইসলাম, গোপনে খুঁজছে সমঝোতার পথ

বেসামাল হেফাজত ইসলাম, গোপনে খুঁজছে সমঝোতার পথ

প্রতিদিন ডেস্ক : ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো’- প্রবাদের মতোই তর্জন-গর্জন থেমে গিয়ে চুপসে গেছে হেফাজতে ইসলাম। সারাদেশে তা-বের ঘটনায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে গত তিনদিনে হেফাজত, বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের আড়াই শতাধিক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এরমধ্যে হেফাজতের শীর্ষ নেতা রয়েছেন অন্তত ৩০ জন।

 সরকার হার্ডলাইন বেছে নেয়ার পর নেতাদের পদত্যাগ আর গ্রেফতারে বেসামাল হয়ে সরকারের সঙ্গে গোপনে সমঝোতার পথ খুঁজছে হেফাজতে ইসলাম নামের সংগঠনটি। বৃহস্পতিবার সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব মুফতি শাখাওয়াত হোসাইন রাজীসহ তিনজনকে রাজধানীর শাপলা চত্বরের হেফাজতের তা-বের মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

হেফাজতের তা-বের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া নেতাদের রিমান্ড শুনানির সময়ে হেফাজত নেতাদের পক্ষে আদালতে দাঁড়াননি কোন আইনজীবী। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় অভিযুক্ত হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মামুনুল হককে সোনারগাঁও রয়েল রিসোর্টে সহিংস তা-বসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতারের জন্য খোঁজা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

২০১৩ সালে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে ঘিরে তা-বের ঘটনায় পল্টন থানার মামলায় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব মুফতি শাখাওয়াত হোসাইন রাজীসহ তিনজনের ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ১৫ এপ্রিল রিমান্ডের এই আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোর্শেদ আল মামুন ভূঁইয়া। রিমান্ডে যাওয়া অপর আসামিরা হলেন মুফতি ফখরুল ইসলাম এবং মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম।

ডিবি পুলিশের পরিদর্শক তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ পল্টনের নাশকতার মামলার তিনজনকে আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন। তবে এ সময় আসামিপক্ষে কোন আইনজীবী ছিলেন না। আসামিরা নিজেরাই নিজেদের পক্ষে শুনানি করেন। এরপর আদালত তাদের পাঁচদিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন। বুধবার, ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় লালবাগ থেকে ডিবির একটি টিম মুফতি শাখাওয়াত হোসাইন রাজীসহ তিনজনকে আটক করে। পরে তাদের ২০১৩ সালের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ড আবেদন করে ডিবি পুলিশ।

অপরদিকে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ২০১৩ সালের ৫ মে পল্টন ও মতিঝিলে সরকারী অফিস, যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর অন্তত চারটির এজাহারভুক্ত আসামি আজিজুল হক। 

ওই মামলাগুলোর একটিতে গত সোমবার তাকে গ্রেফতার দেখায় ডিবি। রবিবার গভীররাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকা থেকে র‌্যাব ও ডিবির অভিযানে গ্রেফতার হন তিনি। সোমবার তাকে ঢাকায় এনে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়ার পর এখন জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি পুলিশ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে তা-ব, হেফাজত নেতা মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারি, এবং ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় নজিরবিহীন নৈরাজ্যের নানা বিষয় নিয়ে রিমান্ডে নেয়া হেফাজত নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হেফাজতে ইসলামের আদর্শ বিচ্যুতি হয়েছে অভিযোগ করে পদত্যাগ করছেন হেফাজতের শীর্ষ নেতারা। অন্যদিকে হেফাজতের উগ্রবাদীরা বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেফতার হচ্ছেন। গ্রেফতার আর পদত্যাগে হেফাজত এখন বিপর্যস্ত হয়ে টাল মাটাল অবস্থায় সংগঠনটি। সামনে হেফাজতে গণপদত্যাগ আসছে। এই পরিস্থিতিতে হেফাজত অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে। শেষ পর্যন্ত সংগঠনটি থাকবে কি থাকবে না এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিনে হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ হাসানসহ অন্তত ১২ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে তারা পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন।

হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী পদত্যাগের হুমকি দানকারী নেতাদের অনুরোধ করছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু তার অনুরোধের সত্ত্বেও পদত্যাগ অব্যাহত আছে। সর্বশেষ পদত্যাগ করা হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান বলেছেন যে, হেফাজতকে একটি রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তরিত করা হচ্ছে এবং বিতর্কিত করা হচ্ছে। এজন্যই তিনি হেফাজতের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখতে চান না। তিনি এ কারণেই পদত্যাগ করেছেন।

জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের আমির হওয়ার পরেই হেফাজতের মধ্যে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে জুনায়েদ বাবুনগরী সরকারের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী অবস্থান গ্রহণ করেন, তা হেফাজতের বিভিন্ন মহল গ্রহণ করতে পারেনি। আর গ্রহণ না করার কারণেই তারা মনে করছেন যে হেফাজতে ইসলাম এবং কওমি মাদ্রাসা দুটোর জন্যই নিরাপদ নয়। আর জুনায়েদ বাবুনগরী দায়িত্ব গ্রহণের পরই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে বিরোধিতা, তারপর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী নিয়ে বিরোধিতা করে হেফাজতকে সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করান। এই সময় বিশেষ করে ২৬ মার্চ, ২৭ মার্চ ও ২৮ মার্চে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজতের নেতৃত্বে নারকীয় তা-ব হয়।

 তা-বগুলোকে অনেকে একাত্তরের বর্বরতাকেও হার মানাচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের অপরাজনীতির কাছে বিক্রি হয়ে গেছে জুনায়েদ বাবুনগরী, মামুনুল হক ও তাদের সহযোগীরা।

পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, হেফাজতের তা-বের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। তাদের আইনের আওতায় আনছে। ইতোমধ্যে সারাদেশে হেফাজতের আড়াই শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন, যার মধ্যে বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীও রয়েছে। সারাদেশে তা-বের বিরুদ্ধে সরকারের সাঁড়াশি অভিযানের কারণে হেফাজতের আমির বাবুনগরীর পায়ের তলার মাটি ইতোমধ্যে সরে যাচ্ছে। তিনি এক রকম চাপের মধ্যে আছেন। 

আর বিশেষ করে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যারা, যেমন হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী, হেফাজতের নারায়ণগঞ্জ জেলার সেক্রেটারি বশির উল্লাহদের মতো নেতৃবৃন্দ যখন গ্রেফতার হচ্ছেন তখন বাবুনগরী নিজেই গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছেন। তাকে পরামর্শ দেয়ার মতো এবং সহযোগিতা করার মতো কোন লোকও তিনি পাচ্ছেন না।

হেফাজতের আমির যখন আল্লামা শফী যখন হেফাজতের আমির ছিলেন তখন তিনি সরাসরি সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করতেন। কিন্তু জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরকার পছন্দ করে না এবং তার সঙ্গে জামায়াতের একটি সম্পর্ক এবং স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে গোপন আঁতাতের অভিযোগ আছে। এসব অপশক্তির নির্দেশেই বাবুনগরী সরকারের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছিলেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। 

এ কারণেই এখন হেফাজত যে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করবে, আত্মসমর্পণ করবে বা একটা বোঝাপড়া করবে এমন সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যাচ্ছে। ফলে গ্রেফতার আর পদত্যাগের দুই ধারায় হেফাজত সঙ্কুচিত হচ্ছে। হেফাজতের নেতারাই বলছেন, এ রকম পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামনে হয়ত হেফাজতের কোন নেতাই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

 হেফাজতকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে এবং সংগঠনটি হয়ত নিঃশেষিত হবে এমনটাই মনে করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজতের ব্যানারে জামায়াত, বিএনপি ও নষ্ট বামেরা তা-বের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালায়। সেই অপরাধে ভিডিও ফুটেজ দেখে সারাদেশে তা-বকারীদের গ্রেফতার চলছে।

 ইতোমধ্যে সন্ত্রাসীদের অনেকেই আটক হয়েছে। যারা প্রকাশ্যে বা পেছন থেকে যারা তা-বে ইন্ধন দিয়ে সারাদেশে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে তাদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। এ কারণে সারাদেশে তা-বকারীরা আত্মগোপনে চলে গেছে। তবুও রেহাই পাচ্ছে না। সরকার বলছে যে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এই গ্রেফতার অভিযান চলবে, এক বিন্দুও ছাড় দেয়া হবে না। সরকার কওমি মাদ্রাসায় পড়া দেশের বিরাট জনশক্তিকে আধা দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের উস্কানিতে পড়ে সেই সুযোগটি নষ্ট করছে হেফাজতে ইসলাম।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, হেফাজতের উচ্চপর্যায়ের কিছু নেতা সরকারের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় আসার পথ খুঁজছে। যদিও যারা পথ খুঁজছেন তারা হেফাজতের মূল কমিটিতে এখন সংখ্যালঘু। তাই এই তা-বের প্রকাশ্য নেতৃত্ব দিয়েছে স্বাধীনতার পরে পাকিস্তান থেকে আলেম হয়ে আসা বাবুনগরী আর রাজাকার পুত্র মামুনুল হক যাদের বিরুদ্ধে আল্লামা শফি হুজুরের হত্যার অভিযোগ আছে। সঙ্গে ছিল কিছু জামায়াত, বিএনপি নষ্ট বাম নেতাদের চেষ্টা যাতে তারা সবাই মিলে অবৈধ উপায়ে সরকার পরিবর্তন, ক্ষমতা ও নারী লিপ্সায় বিভোর ছিল। তাই এদের কাছে ভালরা পরাজিত হয়েছেন। 

বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসার ছাত্রদের বিরাট অংশকে যে ভয়ভীতি দেখিয়ে মাঠে নামানো হয়েছিল তার প্রমাণ এখন মিলছে। শিক্ষকদের একটা বড় অংশ এই তা-বের পক্ষে ছিলেন না, তা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। হেফাজতের আমির বাবুনগরী দেশের বিভিন্ন এলাকায় হেফাজতের কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নেবার জন্য সরকারের কাছে আল্টিমেটাম দিয়েছিল। তার দাবি না মানলে সরকার বিরোধী দুর্বার আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছিল হেফাজতের আমির বাবুনগরী। কিন্তু সরকার সেই দাবি গ্রাহ্য করেননি। উল্টা ভিডিও ফুটেজ দেখে দেখে সন্ত্রাসীদের ব্যাপক হারে গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে। বাবুনগরী সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আপোসের জন্য যোগাযোগ করলেও তাতে সাড়া মেলেনি।

 হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী সারাদেশে তাদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে আন্দোলনে নামার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে। হয়ত তারা জামায়াত-বিএনপি জোটের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে। কিন্তু পবিত্র রমজান মাস ও ঈদের আগে দুর্বার আন্দোলনে নামা তো দূরের কথা, এখন হেফাজতের ঘর সামলানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তার দাবি।
দুর্বার আন্দোলন নয়, আল্লাহর গজব পড়বে।

 বাংলাদেশ হেফাজতে ইসলামের নেতাদের গ্রেফতার ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের নির্যাতন ও হয়রানির প্রতিবাদ জানিয়েছেন সমমনা ওলামা-মাশায়েখরা। গ্রেফতার হেফাজত নেতাদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের তীব্র নিন্দা ও আলেমদের হয়রানি বন্ধ না করলে আল্লাহর গজব পড়বে বলে তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল এক টেলিকনফারেন্সে এসব কথা বলেন ওলামা-মাশায়েখরা। জনকণ্ঠ