মাদক সাম্রাজ্যে নতুন প্রজন্ম, কি তার পরিত্রাণ?

মাদক সাম্রাজ্যে নতুন প্রজন্ম, কি তার পরিত্রাণ?

ডা: মো: মাকসুদ আলম ফাহিম::
আজ দেশের যুব সমাজ এক ভয়ঙ্কর ক্রান্তিকাল পার করছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বিধ্বংসকারী মাদকের বিস্তার যুব সমাজকে আজ ধংশের অতলগহবরে নিয়ে যাচ্ছে। আশির দশকের শেষ দিকে ফেনসিডিলের আবির্ভাব হয়। পর্যায়ক্রমে এটার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। নব্বইয়ের দশকে মাদকের জগতে সংযোজন হয় ইয়াবা। এ ছাড়া গাঁজা, আফিম, মরফিন, কোকেন, বিয়ার, ওয়াইন, হেরোইন, মারিজুয়ানা, প্যাথেডিন চোলাইমদসহ রকমারি মাদকের প্রতি তরুণদের আসক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে।সম্প্রতি এলএসডি এর মত ভয়ংকর নেশা দ্রব্য সেবনের খবরে আমরা বিস্মৃত। আমরা এমনই এক নিষ্ঠুর সময়ের মুখোমুখি।
 
আমাদের যুব সমাজকে ধ্বংসের এক গভীর ষড়যন্ত্রের জালে ফাঁসানো হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসার করে দেয়ার এক বৃহৎ পরিকল্পনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের সমগ্র মানচিত্রে।
 
শুধু মাদকের কারণে ছেলের হাতে বাবা মা ভাই বোন, স্ত্রীর হাতে স্বামী, স্বামীর হাতে স্ত্রী প্রতিনিয়ত এ ধরনের হত্যা কান্ড ঘটছে। মাদকের ছোঁয়ায় সম্ভাবনাময় তরুণরা অধঃপতনের চরম শিখরে উপনীত হচ্ছে।
 
মাদক এখন সহজলভ্য। শহর-নগর, গ্রামসহ মফস্বল এলাকায়ও হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়। সংবাদপত্রের পাতায় চোখ রাখতেই যেন কার বুক ফাটা আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠে। আকাশ বাতাস। মাদক নেশা মায়ের বুক থেকে সন্তানকে কেড়ে নিচ্ছে চিরতরে। মাদকের চাহিদা মেটাতে তরুণ-তরুণীরা ক্রমেই অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। অনেক শিক্ষার্থী নেশার মোহে পড়ে সম্ভাবনাময় জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। 
 
*একটি পরিসংখ্যানঃ
মাদক সেবনের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর ৮০ লাখ মানুষ এবং বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ লাখ ২৬ হাজার মানুষ মারা যায়। বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি। সূত্র মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ মাদকসেবী রয়েছে। মাদকসেবীদের শতকরা ৯১ ভাগই কিশোর ও তরুণ। এর পেছনে ব্যয় হওয়া টাকার অংশও কম নয়। ৬০ লাখ মাদকসেবীর পেছনে খরচ করে ৯১,১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তন্মধ্যে কেবলমাত্র ফেনসিডিলই বছরে আমদানি হয় ১৭০০ কোটি টাকার, যা সীমান্ত পথে, যশোর, রাজশাহী, বেনাপোল, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, আখাউড়া ও সিলেট হয়ে দেশে ঢুকছে।
 
* মানুষের মাদকাসক্ত হওয়ার বহুবিধ কারনগুলোর অন্যতম কিছু হল:
মাদক দ্রব্যের প্রতি কৌতূহল, বেকারত্ব ও আর্থিক অনটন, জীবনের প্রতি হতাশা (ডিপ্রেশন), বন্ধু-বান্ধব সঙ্গীদের প্রভাব, মাদক দ্রব্যের সহজ লভ্যতা, পারিবারিক কলহ ও অশান্তি, মাদক দ্রব্যের কুফল সম্পর্কে অজ্ঞতা, কৈশর ও যৌবনে বেপরোয়া মনোভাব, সর্বপরি ধর্মীয় জ্ঞান ও অনুশাসনের অভাব।
 
মাদক থেকে পরিত্রাণের কিছু উপায়:
নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম প্রসার করা, বেকারদের কর্মসংস্থানের প্রসার করা, মাদক বিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা, মাদকদ্রব্যের সহজ লভ্যতা রোধ করা, মাদক পাচারের সাথে সংশ্লিষ্ট ও ব্যবসায়ীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা, মাদক বিরোধী আইনের দ্রুত কার্যকর করা, মাদকদ্রব্যের কুফল সবার কাছে তুলে ধরা, পারিবারিক ভাবে সন্তানদের গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করা এবং যত্নশীল হওয়া, ব্যাপক প্রচারের প্রসারের মাধ্যমে গণসচেতন করে গড়ে তোলা, খারাপ সঙ্গ,বন্ধু বান্ধব  পরিত্যাগ করা, সেবনকারীদের চিকিৎসা,  প্রশিক্ষনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও সামাজিক ভাবে তাদেরকে সুস্থভাবে গড়ে তোলা, আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা, দেশের অভ্যন্তরে মাদকের উৎপাদন এবং পার্শ্ববর্তী দেশের মাদক চোরাচালানের সব পথ বন্ধ করতে হবে, পাঠ্যসূচিতে মাদক সেবনের ভয়াবহতা তুলে ধরা। 
 
মাদকের ছোবল থেকে দেশের তরুণ ও যুব সমাজকে বাঁচাতে শিক্ষার সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কেবল রাষ্ট্রীয়ভাবে নয়, সামাজিক ও পারিবারিকভাবেও সচেতন হতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। মাদকের হাত থেকে তরুণদের মুক্ত করা সমাজের দায়িত্ব। আর এজন্য যথাযথ পদক্ষেপের বিকল্প নেই। আমাদের সবাইকে নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। মুক্ত করতে হবে দেশের যুবসমাজকে। মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির শারীরিক অবস্থারই অবনতি ঘটায় না বরং একটি সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সভ্যতাকেও ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে। তাই আমাদের উচিত মাদকবিরোধী তীব্র আন্দোলনে সোচ্চার হওয়ার মধ্য দিয়ে যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করা। নয়ত মাদকের ভয়ঙ্কর থাবায় ধ্বংস হবে আমাদের  রাষ্ট্রব্যবস্থা।
 
লেখক
পাবলিক হেলথ এক্টিবিস্ট
কেন্দ্রীয় সদস্য
জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন সংস্থা
সিলেটপ্রতিদিন/এসএএম