সাইদুর রহমান সাঈদ'র কবিতা গ্রন্থ ‌‌‘স্বদেশের মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে চেতনার ঢেউ'

সাইদুর রহমান সাঈদ'র কবিতা গ্রন্থ ‌‌‘স্বদেশের মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে চেতনার ঢেউ'

বাবুল আহমদ

অনেককেই আক্ষেপ করে বলতে শুনি ‘বাঙালি বই পড়তে ভুলে গেছে’ কথাটা কতটুকু সত্য তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কেননা যে জাতি তার ভাষার জন্য রক্ত দিতে পারে, যে জাতির অন্যতম পরিচয় মহান একুশের বইমেলা; সেই জাতি পাঠ বিমূখ এটা মানতে কষ্ট হয়। বছরে যত সংখ্যক বই প্রকাশিত হয় এবং ফেব্রুয়ারিতে দেশজুড়ে বইমেলায় প্রকাশের নিমিত্ত লেখক প্রকাশকরা যেভাবে বছরজুড়ে ব্যস্ত থাকেন তাতে কে বিশ্বাস করবে যে বাঙালি বই পড়তে ভুলে গেছে বা যাচ্ছে? যদি বলি ‘জ্ঞানই আলো’ তা হলে অবশ্যই বই পড়তে হবে। জ্ঞানর্জনে বইয়ের বিকল্প আর কি হতে পারে? জ্ঞান অন্বেষণে একখানা ভালো বই যেকোন সম্পদের চেয়ে মূল্যবান। হ্যাঁ একখানা ভালো বই। ভালো বইয়ের জন্য একজন ভালো লেখক দরকার। বাজারে হাজারো লেখকের অসংখ্য বই পাওয়া যাবে কিন্তু একটি ভালো বই পাওয়া সত্যি শ্রমসাধ্য। ভালো বইয়ের জন্য একজন লেখককে অনেক কাঠ-খড় পুড়াতে হয়। অনেকেই লিখেন বা লিখছেন কিন্তু তাদের লেখা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাঠককে কোনো লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায় না। … … একটি ভালো বই চির যৌবনা। তাই ভালো কিছু লেখার জন্য লেখককে লক্ষ্য স্থির রাখতে হয়। হতে হয় সমাজ সচেতন। চলমান সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাকে অক্ষরের মাধ্যমে তুলে আনতে হয় পাঠক সমাবেশে। সাহিত্যের মধ্যে সবচেয়ে আবেগের জায়গাটি হল কবিতা। তাই একজন বিখ্যাত নাট্যকার কিংবা একজন প্রাবন্ধিক অথবা উপন্যাসিক কবিতা লিখেন নি বা কবিতা লিখবেন না এটা ভাবা যায় না। আবার অনেকেরই লেখক জীবনের শুরু কবিতা দিয়ে। সব্যসাচি লেখক হয়েও তার পরিচয় প্রধানত কবি। আজ তেমনি একজনের কবিতার বই নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাতে এই দীর্ঘ ভূমিকা টানতে হল।

কবিতার বই ‘স্বদেশের মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে চেতনার ঢেউ’ কবি সাইদুর রহমান সাঈদ। লেখক নিজেকে কবি বলতে সংকোচিত কারন শুধু কবিতা লেখাই তার ব্রত নয়। তিনি মূলত একজন লেখক। তার প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ-নিবন্ধের বই ‘লাল-সবুজ ভালোবাসার সংগ্রাম’। পেশাগত জীবনে একসময় সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়েছিলেন। তাই তার লেখায় গভীর জীবনবোধ দেশপ্রেম ও সমাজ বাস্তবতার চালচিত্র স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে। ইতিপুর্বে তার কাব্যগ্রন্থ ‘সাম্যবাদী চেতনার ছায়া’ প্রকাশিত হয়েছে। এবারে প্রকাশিত হল ‘স্বদেশের মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে চেতনার ঢেউ’। অমর একুশের বইমেলাকে কেন্দ্র করে ২০১৭’তে বাসিয়া প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশ করেছেন মোহাম্মদ নওয়াব আলী। বইটিতে ১০৪টি কবিতা সন্বিবেশিত রয়েছে। বলে রাখি আমি নিজে কবিতা তেমন বুঝি না কিন্তু কবিতা পড়তে ভালোবাসি। আলোচ্য বইয়ের প্রথম কবিতাটি আমাকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে এবং বইয়ের প্রায় সব কয়টি কবিতা পড়ে ফেলি। তার কবিতা পড়ে মনে হয়েছে, তিনি শুধুই একজন আবেগি লেখক নন অত্যন্ত সমাজ সচেতন, সময় সচেতন ও লক্ষ্যবেদি লেখক। ‘স্বদেশের মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে চেতনার ঢেউ’ বইয়ের প্রথম কবিতার সপ্তম লাইন থেকে উধৃতি দিলেই বোঝা যাবে কতটুকু জাগ্রত মানসিকতায় লেখক তার লেখনি দ্বারা চলমান সময়ের কিশোর-কিশোরী তরুণ-তরুণী যুবক-যুবতীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাইছেন। কবি লিখছেন-

“বায়ান্ন থেকে একাত্তরের দিকে বাঙালির
যে যাত্রা শুরু হয়েছিলো
বাঙালি জাতীয়তাবোধের উন্মেষ, জাতিগত চেতনার বিকাশ
ধাপে ধাপে আন্দোলন সংগ্রাম
স্বাধিকার স্বায়ত্বশাসন মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা
এইসব ইতিহাস তোমরা কতটুকু জান কিংবা
উপলব্ধি করার মতো শিক্ষা তোমাদের আছে কি না
আমি জানি না।”
পরের লাইনেই তিনি বলছেন,-
“তবে যদি না থাকে তোমাদের ইতিহাস চেতনা তাহলে তোমরা
কোনোদিন মানুষের কাতারে সামিল হতে পারবে না”

গদ্য রীতিতে লিখা তার সমস্ত কবিতা এমনি ভাবে চেতনার গভীরে খোঁচা দিয়ে জাগিয়ে তোলে দেশপ্রেমিক মানুষের আত্মা।“বাঙালি জাতি তার মাতৃভাষার ওপর পাকিস্তান রাস্ট্রের কর্তৃত্বকে ধ্বংস করেই থেমে থাকে নি। ভাষা আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম পাকিস্তান নামক সাম্প্রদায়িক রাস্ট্রটিকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। শত্রুর  মুখে ছাঁই দিয়ে একুশের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক চেতনা আজ বাঙালির জাতীয় জীবনের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে‌ মর্যাদার আসন দখল করেছে।”(সগৌরবে জেগে ওঠে স্বদেশ)। আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈচারবিরোধী আন্দোলন, ঘাতক দালাল রাজাকারের বিচার কিংবা রাজনীতির মুখোশে গরীব দুঃখি মানুষের এই দেশে অবাধ লুটপাটের ধারাকেই শুধু নয় জাতির জনকের সপরিবারে আত্মত্যাগ, স্বাধীনতা বিরোধীদের আস্ফালন, জাতীয় পতাকার অবমাননা, জাতীয় সংগীতের বিকৃতচর্চা ইত্যাদি বিষয়গুলো তার কবিতায় অত্যন্ত স্পষ্ট উচ্চারণে স্থান পেয়েছে। ‘অন্ধকারে ঢেকে যেতে দিতে পারি না’ শিরোনামের কবিতার দেখতে পাই:

“জনকের হত্যার পর এদেশে আবার জন্ম নেয় অবাঞ্চিত আগাছা
লুটেরা লম্পট খুনি ও মৌলবাদী অপশক্তির উত্থান ঘটে।
নতুনভাবে আবার নতুন প্রজন্ম শহিদের রক্তেভেজা মাটি ছোঁয়ে শপথ নেয়
একাত্তরের চেতনায় আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াই
আমরা আমাদের রক্তমূল্যে অর্জিত মাতৃভূমি থেকে
দেশ ও জাতিদ্রোহী সকল অপশক্তি নির্মুল করতে চাই
সকল মিথ্যার বীজ উপড়ে ফেলে দিতে চাই সমূলে
আমাদের গৌরবের লাল সবুজ মানচিত্রকে আমরা
আবার অন্ধকারে ঢেকে যেতে দিতে পারি না”।

কবি যেমন দ্রোহের কবিতা লিখেছেন, তেমনি প্রেমের কবিতাও লিখেছেন। লিখেছেন বাঙালির ঐতিহ্য উৎসবের কথা। স্বপ্নীল ভালোবাসা শিরোনামে কবি যখন লিখেন:
‘ঘূর্ণিস্রোতের মতো কবোষ্ণ রমণির অন্তরঙ্গ দীর্ঘশ্বাস
ঢেউ তোলে পাইনের বনে।
মাধবী লতার মতো কোমলতার মাঝে ডানা মেলে
স্বপ্নীল ভালোবাসা।
ভরা যৌবনের তাড়না তারে হাত ধরে নিয়ে যায়
যুগল জীবনের পবিত্র মন্ত্রপাঠে।
মুক্তার দানার মতো চকচক করে চোখের ভাষা।
বুকের আগুনে পুড়ে শব্দহীন ভালোবাসার ঘ্রাণ
মায়াবী অন্ধকারে ডুবে যেতে তার ভালই লাগে’।

কবিতাটি পাঠ করে আমাদের চোখও কী মুক্তার দানার মতো চকচক করে ওঠে না! কী অসাধারণ উপমা ‘মুক্তার দানার মত’ চকচক, আবার ‘মায়াবী অন্ধকারে ডুবে যেতে’ এখানেও অন্ধকারকে মায়াবী বলা হয়েছে প্রিয়া সান্নিধ্যের আকাঙ্খায়। কবি সাইদুর রহমান সাঈদ প্রধানত দ্রোহের কবি। বই জুড়ে ১০৪টি কবিতার মাঝে প্রেম ভালোবাসা বা ঋতুবৈচিত্র নিয়ে কিছু কবিতা থাকলেও তার অধিকাংশ কবিতাই শোষণ শাসন স্বৈরাচার গণতন্ত্রের নামে দুরাচার অবাধ লুটপাট, ঘুষ দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাই তো বৈশাখের পংক্তিমালা কবিতায় দেখি-

৩.
বৈশাখের ঝড়ের তান্ডবে ভেঙে যাক
ধর্মান্ধ অপশক্তির রক্তরঞ্জিত হাত।
বৈশাখের রুদ্রদহনে পুড়ে ছাঁই হোক
মৌলবাদী ঘাতকদের সর্বনাশা চক্রজাল।
সব অপসংস্কৃতি পুড়ে ছারখার হোক
বৈশাখের অবিনাশী চেতনার অনন্ত আগুনে।

যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই কবিতায় কবি নিজেই বলছেন “আমি মহান একুশে ও একাত্তরের চেতনায় উজ্জীবিত সংগ্রামী মানুষ, আন্দোলন সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আমি আজ এখানে এসেছি। আমি আজ কুখ্যাত নরঘাতক একাত্তরের পিচাশ বাহিনী ঘৃণিত শকুনের দল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি।… … … একাত্তরে যেসব হায়েনারা পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল মুক্তিকামী মানুষের ঘরবাড়ি, লুটে নিয়েছিলো তাদের সহায় সম্পদ, এদেশের যেসব বেজন্মারা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলো আমি সেইসব খুনি ঘাতক দালাল রাজাকার আলবদর আলশামস্ সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই”।

সমস্ত বই জুড়ে এমনি শাণিত কথার ঝনঝনানি। আপাদমস্ত সংগ্রামী এই মানুষটি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে জীবনের মূল্যবান সময়টুকু কাটিয়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। সময় দিচ্ছেন শিশু কিশোরদের মনে বাঙালি চেতনাবোধ ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার কাজে।

পঁচাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে বাঙলার ভাগ্যাকাশে দুের্যাগের যে কালো মেঘ জমে ওঠে তারই প্রভাবে বিশেষত তরুণ সমাজে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় তাতে শংকিত হয়ে কবি তার ‘তারাও মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন-
১.
‘এমন একটা সময় ছিলো-
এদেশের স্বাধীনতার জন্য দেশপ্রেমিক তরুণেরা- রাজপথে
মিছিলে যেতো।– একাত্তরে যুদ্ধ করে তারা জীবন
দিয়েছে- স্বাধীনতা এসেছে, মুক্তি এখও আসে নি।
এখন সময় বদলে গেছে-
আমাদের স্বাধীনতার চেতনার বিরুদ্ধে হাজার হাজার- বিভ্রান্ত
ছাত্র-তরুণ-যুবক রাজপথে মিছিলে নামে- মহান
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী স্লোগানে- কলুষিত হয়
প্রিয় স্বদেশের নির্মল বাতাস’

শুধু কি ছাত্র-তরুণ-যুবক? না, বিভ্রান্ত হয়েছেন আমাদের সমাজপতিরা, প্রবীণরা, রাজনীতিবিদরা, শিক্ষকরা, শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা। তাই তো সমাজ বাস্তবতার নিরিখে কবি তার একই কবিতার ২নং পংক্তিতে লিখতে বাধ্য হন-

২.
‘এখন সময় বদলে গেছে-
চরম ক্ষমতালোভী লুটেরা প্রবীণেরা মানবসভ্যতা বিরোধী ধ্বংসযজ্ঞে-
সুকৌশলে নবীনদের অবিরাম উষ্কানি দেন- তারা
ইতিহাসের মিমাংসিত সত্যকে বিতর্কিত করেন- নবীনদের
বিভ্রান্ত করার মতো গাদ্দারী করেন। -ক্ষমতা
দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়ার ষড়যন্ত্রে বিভোর থাকেন-
নবীনদের মনে হিংসা প্রতিহিংসা ও লোভ লালসা উষ্কে দেন তারা-
সন্ত্রাসের পক্ষে দাঁড়াতে তাদের শক্তি যোগান-
সত্যের বিপরীতে দাঁড়াতে তাদের সাহস যোগান- মৌলবাদী
অন্ধকারে মিশে যেতে তাদের উজ্জীবিত করেন।’

“স্বদেশের মাটির ঘ্রাণে জেগে ওঠে চেতনার ঢেউ” নামকরণের স্বার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় প্রতিটি কবিতার ভাঁজে ভাঁজে। এমন লক্ষ্যভেদি কবিতার সমাহার একই বইয়ে খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। সাড়ে চার ফর্মার শক্ত মলাটে বাঁধাই এই কবিতার বইটিতে পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭২, কবিতার সংখ্যা ১০৪টি। চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী তামিম বিন ইমদাদ। গদ্যরীতিতে লিখা প্রতিটি কবিতাই সুখপাঠ্য এবং স্বদেশপ্রেমের চেতনায় মূর্ত। সব শ্রেণীর পাঠকের জন্য অবশ্য পাঠ্য বইটির বহুল প্রচার ও প্রসার আশা করছি। বইটি অনলাইন পরিবেশক রকমারি ডট কম। মূল্য রাখা হয়েছে ১৫০ টাকা মাত্র।

লেখক: কবি ও নাট্যকার।


সিলেট প্রতিদিন/এমএনআই-১২