সিলেটের বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছোট শিশু আবিদের বড় পৃথিবী

সিলেটের বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ছোট শিশু আবিদের বড় পৃথিবী

প্রতিদিন ডেস্ক :: বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশু আবিদ। পড়ছে চতুর্থ শ্রেণিতে, শাহজালাল রাগীব-রাবেয়া প্রতিবন্ধী ইনস্টিটিউটে। এগারো বছরের এই শিশুটির রয়েছে বহুমুখি প্রতিভা। 

পড়ালেখা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি তার রয়েছে একটি নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস এতিহ্যবাহী বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে সে বিভিন্ন ভিডিও নির্মাণ করছে। সেগুলো করছে ইশারা ভাষায়। সেই ইশারা ভাষায় নির্মিত বিষয়গুলো অনেক সময় ইংরেজিতে অনুবাদ করছেন তার বাবা। তার নির্মিত সেই ভিডিও দেশ-বিদেশে বিপুল প্রশংসা লাভ করছে। 

ভবিষ্যতে সে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করারও ইচ্ছে পোষণ করছে। সিলেট নগরীর নয়াসড়ক এলাকার (বিহঙ্গ ১৫/এ) বাসিন্দা আবিদ আহমদ। ভালো এবং মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে তার সুনাম রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। পড়ালেখার পাশাপাশি একবছর ধরে সে চালিয়ে যাচ্ছে ‘আবিদ ব্লগস’( Abid Vlogs) নামে তার ইউটিউব চ্যানেল। একবছরে অন্তত ২৩টি ভিডিও সে নির্মাণ করেছে। 

প্রখর মেধার অধিকারী শিশুটি যেখানে বেড়াতে যায়, সেই স্থানের ইতিবাচক বিষয়গুলো ভিডিও করে সেটি তার চ্যানেলের মাধ্যমে তুলে ধরছে। সিলেটের রেল স্টেশন, ঐতিহাসিক আলী আমজাদের ঘড়ি, ক্বীনব্রীজ, প্রাকৃতিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ তার চ্যানেলের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে। সেই কাজে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন বাবা রিয়াদ আহমদ। অনেক মৌলিক ভিডিও ইংরেজিতে ভাষান্তর করতে পাশে রয়েছে বাবার সহযোগিতা। 

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন হয়েও অধম্য মেধাবী ছোট শিশুটির সৃজনশীল এবং নন্দিত কাজগুলো দেখে বিমোহিত হয়েছেন দেশের অনেক বড় মানুষ, প্রতিষ্ঠান। দেশের অনেক ইউটিউব প্রতিষ্ঠানের নির্মাতা তাকে দেখার জন্য ছুটে এসেছেন বাড়িতে। 

শাহজালাল রাগীব-রাবেয়া প্রতিবন্ধী ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক হ্যাপী রাণী দে জানান, ‘শিশুটি অন্য ছেলেমেয়েদের থেকে আলাদা এবং মেধাবী। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও সে মেধার স্বাক্ষর রাখছে।’

মহামারি করোনা ভাইরাসে মানুষকে সচেতন করতে তার একটি ভিডিও রয়েছে। মাত্র কয়েক মিনিটের সেই ভিডিও বিপুল প্রশংসা পেয়েছে। সেই ভিডিও’র মাধ্যমে সুরক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। আর সেই ম্যাসেজগুলো সে ইংরেজিতে নিজে লিখে তুলে ধরেছে।

সিলেটের নয়াসড়কের প্রাচীন মসজিদ ভেঙ্গে নতুন করে নির্মাণের কাজ চলছে। কিছুদিন পূর্বে সেই মসজিদ নির্মাণ কাজে সহযোগিতা করার জন্য একটি ভিডিও নির্মাণ করে শিশুািট। সেখানে ইশারার ভাষায় নানা ভঙ্গিমায় সে বুঝাতে চেষ্টা করেছে সহযোগিতার বিষয়টি। শিশুটির সেই কাজ সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নজর কাড়ে। তিনি ভিডিওটি দেখে অভিভূত হন, প্রশংসা করেন। ভিডিওটিতে মেয়রের একটি বক্তব্যও রয়েছে।

আবিদের ইশারার জগৎ বড়ই বিচিত্র। তার ছোট্র হৃদয়ে বাস করে অনেক বড় এক মানবিক পৃথিবী। পড়ালেখা, ছবি আঁকা, নিজের চ্যানেলে সিলেটের সৃজনশীল কাজ তুলে ধরার পাশপাশি শিশুটির আরো কিছু গুণ শুধু পরিবার নয়, প্রশংসা পেয়েছে পরিচিত মহলে। 

বাবা রিয়াদ আহমদ জানান, ‘সে খুব মানবিক এবং পরিচ্ছন্ন চেতনাবোধ সম্পন্ন মানুষ। কঠোর পরিশ্রমিও। সবসময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে। নিজের সাইকেল, নিজের পোশাক, শখের জিনিসপত্র নিজেই ধুয়ে মুছে রাখে। পরিপাটি করে রাখে প্রতিটি কক্ষ, পুরো বাড়ি। 

তিনি আরো বলেন ‘আবিদ গরিব শিশুদের ভালোবাসে। কোনোকিছু নষ্ট হতে দেয়না। অবশিষ্ট খাবারগুলো অসহায় মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পছন্দ করে। প্রায় সময় লুকিয়ে গরিব পথশিশুদের মাঝে নিজের কাপড় দিয়ে আসে।’

দুই ভাই, একবোনের মধ্যে আবিদ দ্বিতীয়। বাবা একজন ব্যবসায়ী এবং মা শেলি বেগম গৃহিনী। আবিদের দাদা সিলেটের সিনিয়র আইনজীবী এম এ মুনিম খসরু। 

বাবা রিয়াদ আহমদ জানান, ‘জন্মের পর বয়স যখন আট মাস সেসময় আবিদ প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়। তারপর একপর্যায়ে ভারতে নিয়ে যাই। লাভ হয়নি। দেড় বছর বয়সে সে ইশারায় বলা শুরু করে। তবে বধির হলেও আমার কোনো আক্ষেপ নেই। সে প্রচন্ড মেধাবী। কোনোকিছু একবার দেখামাত্র নিজে সেটি করে ফেলে। ভবিষ্যতে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করার প্রবল ইচ্ছে রয়েছে তার।

শিশুটির ব্যাপারে কথা হয় সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সাথে। তিনি প্রশংসা করে বলেন, ‘শিশুটি এত কম বয়সে অনেক বড় বড় মানবিক এবং সামাজিক কাজ করছে। যা বড়দের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে।’

সিলেট প্রতিদিন/এমএ/সিলেটের ডাক