সিলেটে রাবিদের মৃত্যু: হত্যা-আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা!

সিলেটে রাবিদের মৃত্যু: হত্যা-আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা!

প্রতিবেদন প্রতিবেদক :: নগরীর কাজিটুলা উঁচা সড়কের চৌধুরী ভিলার ছাদ থেকে পড়ে রাবিদ আহমদ নাজিমের মৃত্যুর ঘটনার কোন কিনারা হয়নি এখনো। বিষয়টি হত্যা, আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা- এনিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের সাথে আলাপের পর বিষয়টিকে দুর্ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে অধিকাংশ সূত্রের।

সোমবার সকাল পৌণে ৯টার দিকে নগরীর কাজিটুলা উঁচাসড়কের চৌধুরী ভিলার ৫ম তলার ছাদ থেকে ‘ধপাস’ করে কিছু একটা পড়ার শব্দ শুনতে পান নিচতলার এক ভাড়াটিয়া বৃদ্ধা। সাথে সাথে তিনি বাসার কেয়ারটেকার আব্দুল মালেক ও মালিক পক্ষের প্রতিনিধি মারুফকে ডাকাডাকি করে বিষয়টি জানান।  তারা ছুটে গিয়ে দেখেন, রাবিদ আহমদ নাজিম পড়ে আছেন। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান তার খালাতো ভাই হিসাবে পরিচিত বালাগঞ্জের গহরপুরের মৃত আলা উদ্দিনের দুই ছেলে আকবর ও ইয়ামিন।

সরজমিনে চৌধুরী ভিলায় গিয়ে ফ্লাটের কেয়ারটেকার, অধিবাসী এবং আকবর ও ইয়ামিনের মায়ের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারির দিকে চৌধুরী ভিলার তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন রাবিদ আহমদ নাজিম ও আকবর। তখন রাবিদ নিজেকে আকবরদের বড় ভাই হিসাবে পরিচয় দিয়েছিলেন। এরপর কয়েক মাসের ভাড়া বকেয়া থাকলে বাড়ির মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মারুফের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে তিনি জানান, তার বাড়ি শাহপরাণ থানার পিরেরবাজারে। বাবার নাম নূর মিয়া। আকবর বা ইয়ামিন তার খালাতো ভাই। মারুফ জানান, তারা বাসা ভাড়া নেয়ার কিছুদিন পরই প্রতিবেশি ফ্লাটগুলোর অধিবাসীরা অভিযোগ জানাতে থাকেন যে, রাবিদদের ফ্লাটে নিয়মিত ঝগড়া বিবাদ হই-হুল্লোড়ের কারণে তারা ঘুমাতে পাারেন না। নানা অসুবিধা হয়। এমনকি রাবিদ নাকি প্রায়ই মধ্যরাত থেকে শেষ রাতের দিকে তার বন্ধ-ুবান্ধব নিয়ে ফ্ল্যাটে আসতেন। হইহুল্লোড় করতেন। এনিয়ে মালিকপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার পর বাসা ছাড়ার জন্য তাদের নোটিশ দেয়া হয়েছিল। তখন রাবিদ ৩তলার বাসা ছেড়ে ৫ম তলায় চলে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং  মালিকপক্ষও তা মেনে নেন। সেই থেকে তারা ৫ম তলায়ই আছেন। 

জানা গেছে, রাবিদ তার  আয়-রোজগার নিয়ে অনেক বড়বড় কথাও বলতেন। নিজেকে সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় দিতেন। এমনকি দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সিলেট প্রতিনিধি হিসাবে তিনি কাজ করেন বলেও নিজের ভিজিটিং কার্ড বিলি করতেন। তার মোটরসাইকেলে ‘প্রেস’ বা ‘সাংবাদিক’ স্টিকার লেখা থাকতো। এমনকি এখনো তিনি যে ঘরে থাকতেন তার দরজায় ‘প্রেস’ লেখা স্টিকার ও একটি অনলাইন সংবাদপত্রের নাম লেখা আছে। 

তবে যায়যায় দিন পত্রিকার সিলেট প্রতিনিধি আব্দুল কাইয়ুম উল্লাস জানান, রাবিদ অনেক বছর আগে যায়যায়দিন পাঠক ফোরামের সাথে জড়িত ছিলেন। এরপর তার সাথে আর যায়যায় দিনের কোন সম্পর্ক নেই।

জানা গেছে, রাবিদের কক্ষে রাতভর বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা হতো। তার মৃত্যুর পর কক্ষটির থাই গ্লাস ও সানসাইট কম্বল এবং  ভারি কাপড় দিয়ে ঢাকা থাকতো । সংশ্লিষ্টরা এর কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না। তবে রাবিদের মৃত্যুর পর তার কক্ষ থেকে উদ্ধার হওয়া নেশাজাতীয় দ্রব্য দেখে কেউকেউ মনে করছেন অতিরিক্ত নেশা সেবনের পর তিনি ছাদে উঠে ঘোরাঘুরি করেছেন। তখন ৩/৪ ফুট উঁচু নিরাপত্তা দেয়ালের উপরে উঠেও পায়চারি করেছেন বলে মনে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। সেখানে পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালী থানার ওসি এএসএম আবু ফরহাদ। তবে ছাপগুলো খুব হাল্কা ছিল। দেখে তারা মনে করছেন, এখানে কেউ একজন পায়চারি করেছে। আর এতেই দুর্ঘটনায় রাবিদের মৃত্যুর ধারণাটা আরও জোরালো হচ্ছে। অতিরিক্ত নেশার ঘোরে হয়ত রাবিদ সেখানে পায়চারি করতে করতে পড়ে গিয়ে মারা যেতে পারেন।  

এ বিষয়ের সাথে রাবিদের আত্মহত্যার বিষয়টিও সামনে চলে আসছে। কারণ, রাবিদের একসময় করিম উল্লাহ মার্কেটে মোবাইল ফোনের ব্যবসা ছিল। করোনার কারণে সে ব্যবসায় লোকসানের মুখে পড়ে হয়ত হতাশাগ্রস্ত হয়ে নেশায় আসক্ত হয়ে পড়তে পারেন। এমনকি ঘনিষ্ঠদের সাথে তার নেশার ব্যবসাও থাকতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তার আত্মহত্যার বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছেনা।  

বৃহস্পতিবার শাহনিয়া ও তার ভাই আকবরের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। শুক্রবার থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ হবে। তারপর আসবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন। সবকিছু নিয়ে সুক্ষ্ন বিচার বিশ্লেষণ শেষে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য।

সিলেটপ্রতিদিন/ইকে/এসএল