সিলেটে সাংবাদিকতা: সাংবাদিকনেতা-সুধীসমাজের দায়িত্ব

সিলেটে সাংবাদিকতা: সাংবাদিকনেতা-সুধীসমাজের দায়িত্ব

মিসবাহ উদ্দীন আহমদ :: আমাদের এই পূণ্যভূমে সাংবাদিকতার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। উপমহাদেশে অন্যান্যস্থানে এমনকি রাজধানীতেও জোরালোভাবে যখন সাংবাদিকতার চর্চা গতি পায়নি; ঠিক সেই প্রাচীনে সবুজ শ্যামলিমা ঘেরা টিলা-পাহাড়ের জনপদে, চা-কমলার দেশে, ওলি-আউলিয়া, সাধক পুরুষদের দেশে একদল জ্ঞানী-গুণী সাংবাদিকতাকে আলোকিত করেছেন। যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণোজ্জ্বল।

সিলেটের মূলধারার সাংবাদিকসমাজ ডিজিটালযুগে এসেও পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন সেই সব সমাজসেবক সাংবাদিকদের, জ্ঞানী-গুণীজনদের। হ্যা তাদের কারণেই এই দেশে, এমনকি এই উপমহাদেশে সাংবাদিকতা পেয়েছে অন্যমাত্রা। সাংবাদিকতা পেয়েছে সম্মান, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। মানুষ আজও চরম বিপদে যখন কারোর কাছেই আশ্রয় খুঁজে পায় না, তখন দ্বারস্থ হন সাংবাদিকসমাজের। জাতির বিবেকের সহযোগীতা তাদের বিপন্ন মনে প্রেরণার মন্ত্র জোগায়।

সম্প্রতি সামাজিকযোগাযোগ ফেইসবুক বা ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের কারণে সিলেটসহ গোটা বাংলাদেশে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে প্রশ্নের মুখোমুখি নিয়ে দাঁড় করিয়েছে একদল অশিক্ষিতের দল। সমাজের নানা অনিয়ম থেকে, অপরাধজগত যাদের পুরনো ঠিকানা। যেকোনোমূল্যে এদের থামাতেই হবে। সারাদেশের চিন্তা বাদ দিয়ে শুদ্ধিযাত্রার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কিংবা সিলেটে শতবর্ষের সাংবাদিকতার মান-মর্যাদা রক্ষার তাগিদ থেকে হলেও তাদেরকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে তাদের দৌরাত্ম্য।

এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে দলমত নির্বিশেষে আমাদের সিলেটের সকল সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশককে। জোরালো ভূমিকা নিতে হবে টেলিভিশন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দকে। সুধীজনরাও সাথে থাকতে হবে।

আমাদের মধ্যে বিদ্যমান স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও আদর্শগত বিরোধ থাকতেই পারে। সেটি ক্ষমতাসীন দল, বিরোধীদল, আইনজীবী, চিকিৎসকসহ প্রত্যেকটি প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনেই থাকা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এটাকে একপাশে রেখে সবাইকে দলমতের উর্ধ্বে গিয়ে সিলেটের সাংবাদিকতার মান-মর্যাদা রক্ষার তাগিদে পথে নামতে হবে। কাজ করতে হবে। বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিতে হবে। দায়সারাভাবে এড়িয়ে গেলে চলবে না।

প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে দেন-দরবার করতে হবে। তাদেরকে জানাতে হবে, আমাদের ঘরের বিরোধ ঘরে থাকুক। সমাধান হলে হবে, ঘরের বিরোধ সমাধান না হলেও সাংবাদিকতার কিংবা গণমানুষের অন্তত বড় ক্ষতি নেই। কিন্তু সিলেটের সাংবাদিকতার সুবর্ণ অতীত রক্ষায়, বর্তমানকে উজ্জ্বল করে উজ্জ্বলতরদিকে নিয়ে যেতে সবাইকে ভেদাভেদভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি দাঁড়াতে হবে। একই ব্যানারে, একই টেবিলে বসতে হবে। মুখ ছাড়তে হবে।

অপসাংবাদিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এটাকে দমাতে যদিও বেশ সময় দিতে হবে। তবে বেগ পেতে হবে না; এটা দমানো-থামানো কোনো বিষয়ই না। শুধু মুরব্বিদের একযোগে বলতে হবে, ‘সিলেটে কোনো অপসাংবাদিকতা চলবে না। না, না এবং না!’

আমরা তরুণ-যুবা যারা আছি তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাথে নিয়ে অপরাধীদের চিহ্নিত করে একে একে বিচারের মুখে তুলে দিবো। আমরা প্রস্তুত রয়েছি। শতবর্ষের সাংবাদিকতার সোনালি ইতিহাস রক্ষায়।

অপসাংবাদিকতা বা তথাকথিত স্ট্রিমিং জার্নালিজম এতোদূর এগুনোর পেছনে মূলত সিলেটেরই কিছু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, হবু জনপ্রতিনিধি, কিছু সিনিয়র মূলধারার সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরাও দায়ী। হয়তো তারা জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারেই কাজটি করে ফেলেছেন। তবুও দায় তাদেরই।

হ্যা। আপনারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন, দুধকলা খাইয়েছেন। নিজেদের অনুষ্ঠান আয়োজনে, ত্রাণবন্টনে; মূলধারার সাংবাদিকদের না জানিয়ে, দাওয়াত না দিয়ে তথাকথিত বুমওয়ালাদের ডেকেছেন। নিজেরাও ‘নামীদামী টেলিভিশনের মতো দীর্ঘসময় নিয়ে, সেজেগুজে’ লাইভম্যানের বুমের সামনে বকবকানি করেছেন; ‘একান্ত সাক্ষাতকার’ দিয়েছেন। একবারও ভাবেননি সেই লাইভম্যানের যে লাইটম্যানেরও যোগ্যতা ছিলো না!

ভুলে গেলে চলবেনা অথচ এই আপনারাই যখন বড় কোনো বিপদে পড়েন, তখন চুপিচুপি রাতের আঁধারে মূলধারার সাংবাদিকের বাসা পর্যন্ত দৌঁড়ে যান, গিয়েছেন। কিংবা ফোন কথোপকথনে পরামর্শ নেন, নিয়েছেন। এমন বড় বিপদ সামনে যে আসছে না, তার গ্যারান্টি তো নেই!

আপনাদের উচিত ছিলো বিষয়গুলো আগপিছ ভাবা। প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সাথে; লোকাল পত্রিকার সম্পাদক; মূলধারার জাতীয় সংবাদপত্র-টেলিভিশনের ব্যুরোপ্রধান ও প্রতিনিধি; স্থানীয় পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদকবৃন্দের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা জরুরিভাবে উচিত ছিলো।

আপনাদের অনুষ্ঠান ও কার্যক্রমগুলোতে মূলধারার সাংবাদিকদের পূর্বেকার দিনগুলোর ন্যায় ডেকে নেয়া উচিত ছিল। সেটি আপনারা করেননি। এজন্য সাংবাদিকতার ক্ষতিসাধনে, চলমান পরিস্থিতির পেছনে আপনারাও দায়ী। কেননা এই সিলেটকে আপনারা রিপ্রেজেন্ট করছেন। জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বুঝা উচিত ছিলো।

তবে এই সংবাদকর্মীর দৃষ্টিতে আপনাদের দায় অর্ধেক আর সাংবাদিক নেতাদের, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের দায় বাকি অর্ধেক। কে দায়ী সে তর্কে আর না গিয়ে এবার আসুন দায়মুক্ত হই। বিনীত আহ্বান- ‘সিলেটকে, সিলেটের সাংবাদিকতাকে রাহুগ্রাসমুক্ত করার দায়িত্ব কাঁধে নিই, আসুন।’

আগামীর সিলেটের জন্যে, আগামীর ডিজিটাল সাংবাদিকতার জন্যে একটি সুস্থধারা রেখে যাই। আমার, আপনার সকলের সামান্য উদ্যোগ; সামান্য সময় ব্যয়ের জোরেই হয়তো সিলেটের সাংবাদিকতা ফিরে পেতে পারে তার সুবর্ণ অতীত!

স্বাভাবিকচোখে কঠিন মনে হওয়া সহজ এই কাজটি করতে হলে আমাদের সর্বাগ্রে একসাথে বসতে হবে। এক বেসিনে হাত ধুয়ে একসাথে খেতে হবে। এরপর ভরপেটে একসাথে দীর্ঘ আলোচনা করে জোটবেঁধে প্রতিরোধে যেতে হবে। একবার দু’বার নয়, বেশ কয়েকবার বসতে হবে হয়তো। ধৈর্য হারানো যাবে না। বিশ্বাস ভাঙা যাবে না। বিশ্বাস হারানোও যাবে না।

অনলাইন সাংবাদিকতা শুরুর দিকে যখন সংগঠন গজিয়ে ওঠার রূপরেখা চলছিলো, আলোচনা চলছিলো ২০১২/১৩ সালের দিকে। ঠিক তখনই একদল অগ্রজ নাক সিটকিয়ে অনলাইন সাংবাদিকতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন, দূরে সরিয়ে রাখলেন। অথচ বর্তমানে অগ্রজদের অনেকেরই বেঁচে থাকার অবলম্বন বাতাসে ঘুরেঘুরে ঘরেঘরে খবর পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমটি। সরিয়ে রাখাদের দল ঠিকই ধাক্কাধাক্কি করে জায়গা করে নিয়েছে। ভেবে দেখেছেন কি? আঁচ করতে পেরেছেন কি?

সেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া কিংবা নাক সিটকানোর ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সিলেটে ভার্চুয়ালি সাংবাদিকতাও অপরিপক্ব মানুষের দখলে চলে গেছে, হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ। এখানে শুধু ব্যক্তিবন্দনা আর জনসংযোগ কর্মকর্তাদের পাঠানো প্রেসরিলিজের ভুলত্রুটি কারেকসন করে- কখনোকখনো না করেই চলে দ্রুতগতির প্রতিযোগিতা।

হাতেগোনা কয়েকটি পোর্টাল চালান মূলধারার সাংবাদিকেরা। বাকিগুলো চালান কারা? এদের চিহ্নিত করতে হবে, সবকিছুতেই সরকারের অপেক্ষা করলে চলবে না। আমাদেরই নিয়ম তৈরি করে, সবাইকে নিয়মে নিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে সম্মিলিত ফান্ডের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থায় যেতে হবে। জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, আমলা, সরকারি কর্তা ব্যক্তিদের বুঝাতে হবে কোনটি মূলধারার গণমাধ্যম আর কোনটি অন্তরালের, চিপাগলির।

সোজাসুজি কথায় আসলে সকল প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনের নেতৃত্বে অবশ্যই মূলধারার, পেশাজীবী সাংবাদিকদের রাখতে হবে। বুঝেশুনে, কঠোর যাচাই-বাছাই শেষে দিতে হবে সদস্যপদ। সংগঠনগুলোতে প্রবীণ সাংবাদিকেরা উপদেষ্টার মতো নজরদারি চালাতে হবে। নেতাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতে হবে। প্রবীণদের কথা যারা অবজ্ঞা করবে তাদেরকে তাদের প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিতে হবে।

মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে অপসাংবাদিকতা বিষয়ক সচেতনতামূলক লেখা, প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। টেলিভিশনে মুক্ত আলোচনা রাখতে হবে। যেসব জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, আমলাগণ অপসাংবাদিকদের প্রশ্রয় দেন; তারা মূলত মূলধারার সাংবাদিকতাকে অপমানই করেন। তাই এমন অপমান সহ্য করা যাবে না। তাদের বুঝাতে হবে। না বুঝলে তাদেরকে বয়কট করতে হবে। সেটা সম্মিলিতভাবে একযোগে করতে হবে।

আসা যাক বর্তমান লাইভ স্ট্রিমিং সমস্যার কথায়। এটা সমাধান করার শর্টকার্ট উপায় হচ্ছে মূলধারার সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিটি হাউস থেকে একটা টিমকে লাইভ স্ট্রিমিং জার্নালিজম বা সত্যিকার অর্থের নাগরিক সাংবাদিকতার জন্য মাঠে ছেড়ে দিতে হবে। যেহেতু এটি এখন সময়ের দাবি। তবে মাঠে নামানোর আগে তাদেরকে হাতেকলমে প্রশিক্ষিত করতে হবে। এতেই একটা সময় অপরাধীদের জায়গা সংকোচিত হয়ে আসবে। তারা গা ঢাকা দিবে, তারা কেটে পড়বে। লাইভ স্ট্রিমিংয়ে ইতোমধ্যে মূলধারার বেশকিছু গণমাধ্যম এমন পদক্ষেপের সূচনা করেছে। যা নজরও কাড়ছে। মানুষ তাদেরকে সাধুবাদ দিচ্ছেন। তারা বাহ্বাও কুঁড়োচ্ছেন।

সিলেটের প্রবীণ সাংবাদিকদের সমন্বয়ে সিলেটে কর্মরত মূলধারার মানে পেশাজীবী সাংবাদিকদের তালিকা তৈরি করতে হবে। সেই তালিকা বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, নগর প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ বিশেষভাবে নির্বাচন অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দপ্তরে পৌঁছে দিতে হবে। তাদেরকে অবগত করে রাখা যায় এরা ছাড়া সিলেটে আর কোনো সাংবাদিক নেই। বাকিদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিলে মূলধারার সাংবাদিকদের রাগ-অনুরাগ থাকবে না। বরং তারা সহযোগিতাই করবেন। সম্প্রতি তথাকথিত পিকে টিভির ফয়সাল কাদিরকাণ্ডে যেমনটি করে যাচ্ছেন।

কাজগুলো সহজ হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক অগ্রজ কঠিন মনে করে পিছিয়ে যেতে পারেন; তাদেরকে সাহস যুগাতে প্রয়াত ইকবাল মনসুরের মতো বলিষ্ট পদক্ষেপে রাজপথে, মাঠে-ঘাটে সরব থাকতে হবে তরুণ ও যুবক গণমাধ্যমকর্মীদের। এভাবেই সম্ভব সিলেটে অপসাংবাদিকতা ঠেকানো।

আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গজিয়ে ওঠা সংবাদ প্রচারমাধ্যমে যারা বিজ্ঞাপনদাতা তাদেরকেও সতর্ক করতে হবে যে তারা সরকারের সম্প্রচার নিয়ম ভঙ্গ করছেন। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। তাদেরকে প্রকৃত গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের অনুরোধ জানাতে হবে। প্রয়োজনে টেকনিক্যালি বাধ্য করতে হবে।

এভাবেই কি সম্ভব নয় সিলেটের সাংবাদিকতার সুর্বণ অতীতকে উজ্জ্বল বর্তমানে ফিরিয়ে এনে উজ্জ্বলতর এক ভবিষ্যতে এগিয়ে নেয়া?

বেঁচে থাকুক শতবর্ষের সাংবাদিকতা
বেঁচে থাকি মূলধারার সাংবাদিকেরা
জয় বাংলা।

লেখক:
প্রধান প্রতিবেদক
দৈনিক একাত্তরের কথা

সিলেটপ্রতিদিন/এসএএম