১৪ ফেব্রুয়ারি ও সুন্দরবন রক্ষা জরুরী কেন?

১৪ ফেব্রুয়ারি ও সুন্দরবন রক্ষা জরুরী কেন?

দেলোয়ার হোসেন :: ম্যানগ্রোভ বলতে সমুদ্র উপকূলে জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে বোঝায়। ম্যানগ্রোভ বন জোয়ার-ভাটায় বিধৌত লবণাক্ত সমতলভূমি। পৃথিবীর ১১৮টি দেশে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮০০ বর্গ কিলোমিটারজুড়ে ম্যানগ্রোভ বন আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গজুড়ে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার মোহনায় গড়ে ওঠা সুন্দরবন হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন।বাংলাদেশের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালী জেলার ৬ লাখ ১,৭০০ হেক্টরজুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত , যা দেশের ৪.১৩% । সুন্দরবনের শতকরা ৬২ ভাগই বাংলাদেশের সীমান্তে।

জীববৈচিত্র্য স্থল সামুদ্রিক এবং অন্যান্য জলজ বাস্তুসংস্থান এবং যে অংশের বাস্তুসংস্থানীয় জটিলগুলি সহ বিভিন্ন জীবের মধ্যে পরিবর্তনশীলতা বোঝায়। বাংলাদেশে অবস্থিত একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে এই পরিবর্তনশীলতা বেশি ঘটে থাকে। সুন্দরবন, প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি।

সমীক্ষানুযায়ী, আমাদের এই সুন্দরবনে রয়েছে ৫ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ৩০ প্রজাতির চিংড়ি মাছ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জীব বোইচিত্রের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্রতিনিয়ত বনখেকোদের আগ্রাসনের ফলে নিজের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব অনেকটাই হুমকির মুখে। সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ গোটা দেশের পরিবেশ।

১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সুন্দরবন দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। মূলত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সুন্দরবন দিবস পালন করা হয়। ১৪ই ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবস, ভালবাসা দিবসে ভালবাসুন সুন্দরবনকে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবস পালিত হয়ে আসছে। আসুন আমরাও এই দিবসকে উদযাপন করি ভালবাসার কৃতিস্বরুপ। সর্বপ্রথম ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশের উদ্যোগে এবং দেশের আরও ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করা হয়।

সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করে এলেও মানুষের তৈরি কৃত্তিম দূর্যোগের হাত থেকে সুন্দরবন নিজেকে রক্ষা করতে পারছে না।

গত  ৪-৫ বছরে সুন্দরবনের আশপাশের নদীতে ৭-৮ টি কয়লা ও  জ্বালানি তেল বোঝাই জাহাজ ডুবেছে৷ এর আগে ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার এমভি ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন ডুবে যায়৷ ২০১৫ সালের ৩ মে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবে যায় সার বোঝাই কার্গো জাহাজ এমবি জাবালে নূর৷২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের ভোলা নদীতে ডুবতে-ডুবতে অন্য কার্গোর সহায়তায় মোংলায় পৌঁছাতে সক্ষম হয় আরেকটি কয়লা বোঝাই কার্গো৷ ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর সুন্দরবনের পশুর নদীতে ৫১০ মেট্রিক টন কয়লাবাহী এমভি জিয়া রাজ কার্গো ডুবে যায়৷ ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিকালে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীর ‘হরিণটানা' বন টহল ফাঁড়ির কাছে ১২৩৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে ‘এমভি সি হর্স-১' ডুবে যায়৷

২০১৭ সালের ৪ জুন দিনগত রাতে হারবাড়িয়া চ্যানেলে ৮২৫ টন সিমেন্ট তৈরির কাঁচামালসহ ‘এমভি সেবা' নামে একটি কার্গো তলা ফেটে ডুবে এরকম ৮-১০টি জাহাজ সুন্দরবনের আশপাশে বা ভিতরের নদীতে ডুবেছে৷ তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দুষণের কথা বাদই দিলাম, এই জাহাজগুলো উদ্ধারও করা  হয় না৷ ফলে নাব্যতাও নষ্ট হচ্ছে৷ সার, তেল, কয়লাবাহী জাহাজ ডুবেছে৷ কিন্তু এর ফলে পরিবেশ, জলজ প্রাণী, পানি, জলজ সম্পদ এবং সুন্দরবনের কী পরিমান ক্ষতি হয়েছে তা নিরূপণ করা হয়নি৷ কামিটির কথা আমরা শুনি, কিন্তু প্রতিকার দেখি না৷সুন্দরবনের আশপাশের নদীতে ইরাবতী ডলফিন এই দূষণের কারণে বিপর্যয়ের মুখে আছে৷ তারা হারিয়ে যাচ্ছে৷ মৎস সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে৷ আর সরাসরি সুন্দরবন ক্ষতির মুখে পড়ছে৷ 

এসডিজি-৬ এর অন্যতম লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই গ্রহণযোগ্য কৃষি ব্যবস্থাপনা ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা । কিন্তু আমরা এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারিনি। নেই নি কোনো কার্যকরী প্রদক্ষেপ। সুন্দরবনের জলদস্যুদের হাত থেকে সন্দরবন রক্ষা করা গেলেও আমাদের উচিত এই বনকে বাঁচাতে কার্যকরী প্রদক্ষেপ গরহণ করা।  ইরিত্রিয়ার মৎস্য মন্ত্রণালয় সেখানকার ম্যানগ্রোভ বন রক্ষায় নতুন করে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর সুপারিশ করেছে।

সেনেগালের পরিবেশবিদ ও সাবেক পরিবেশমন্ত্রী হায়দার আলী ১০ বছরে প্রায় ১৫ কোটি ম্যানগ্রোভ বনায়ন করেছেন। সম্প্রতি প্রলয় সৃষ্টিকারী ঘূর্ণিঝড় আম্ফান হওয়ার পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যয় সুন্দরবনে ৫ কোটি ম্যানগ্রোভ বনায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। সুন্দরবন রক্ষার বাস্তবতা বুঝে, আসন্ন পরিবেশ বিপর্যয় থেকে বাঁচতে আমাদেরও সুন্দরবন রক্ষায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন ছাড়া উপায় নেই । তাই আমাদেরকেও এটিকে রক্ষার্থে কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলেই হবে না। সরকারি প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি এনজিও, সিভিল স্যোসাইটি ও প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।