l

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০২:৩৩ অপরাহ্ন


সিলেটে রবীন্দ্র স্মরণোৎসব নিয়ে বিভাজন : পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দুই পক্ষের

সিলেটে রবীন্দ্র স্মরণোৎসব নিয়ে বিভাজন : পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দুই পক্ষের


দেবব্রত রায় দিপন :: ‘সিলেটে রবীন্দ্রনাথ : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’ অনুষ্ঠান নিয়ে তুমুল বিতর্ক এখন নগর জোড়ে। আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর সিলেটে আড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুইদিনব্যাপী এই মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে থাকছেন- উদযাপন পর্ষদের পক্ষ থেকে এমন তথ্য জানানো হয়েছে।

এদিকে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিলেট আগমনের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে বেজে উঠেছে বিভাজনের সুর। একটি পক্ষের দাবি, এটিকে রাজনীতিকরণ করা হচ্ছে। অপর একটি পক্ষের বক্তব্য হচ্ছে-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একটি চক্র ধর্মান্ধ শক্তিকে পাশে রেখে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা চালাচ্ছে। এর ফলে স্পষ্টত অনুষ্ঠানের আগেই সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গণে বিভাজন রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

সার্বজনীন এই উৎসব আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে করা হয় ২৫ সদস্যের একটি আহবায়ক কমিটি। কমিটির নাম দেওয়া হয় ‘সিলেটে রবীন্দ্রনাথ : শতবর্ষ স্মরণোৎসব’ উদযাপন কমিটি। কমিটি গঠনের পর এই আহবায়ক কমিটির নাম নিয়ে লুকোচুরি খেলা শুরু হতে থাকে আয়োজকদের। এমনকি আহবায়ক কমিটির পরিষদে যুক্ত রয়েছেন কারা-এমন তথ্যও জানতে দেওয়া হয়নি সংবাদ মাধ্যমে। শুধুমাত্র পর্ষদের আহবায়ক হিসেবে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মোহিত এবং সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সদস্য সচিব পদের জানান দিয়ে চলতে থাকে উদযাপন কমিটির কার্যক্রম । শুরুর দিকে এই কমিটিকে সাময়িক প্রস্তুতি কমিটি বলে জানানো হলেও কমিটি বর্ধিত না করে একই কমিটি বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে-এমন অভিযোগ করেছেন সিলেটের একাধিক সংস্কৃতিকর্মী।

২৫ সদস্য বিশিষ্ট কার্যনির্বাহী পর্ষদে রবীন্দ্রপ্রেমী নয়-এমন অনেকেই রাখা হয়েছে দাবি করে একটি পক্ষ বলছে, রবীন্দ্রসংস্কৃতি বিরোধী অনেক লোককেই পরিষদে যুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া, সিলেটে আরো একাধিক প্রতিনিধিত্বশীল সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন থাকলেও তাদেরকে ঠাঁই দেওয়া হয়নি কমিটিতে। আইনজীবি সমিতি, শিক্ষক সমিতি, সিলেটে কর্মরত সাংবাদিক কিংবা সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ অনেক পেশাজীবি সংগঠনের প্রতিনিধিকে যুক্ত করা হয়নি কমিটিতে। এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি নগরীর আবুল মাল আবদুল মোহিতের বাসভবনে অনুষ্ঠিত সভায় সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের ক্ষোভের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। সভায় শুরতেই সদস্যসচিব আরিফুল হক চৌধুরীকে নিয়ে আপত্তি তোলেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। উপস্থিতির অধিকাংশই তখন বদর উদ্দিন কামরানের আপত্তির সাথে একমত পোষণ করেন।

তাছাড়া, ওই সভায় এ-ও আলোচিত হয়েছে, স্মরণোৎসব অনুষ্ঠানের কমিটিতে অনেক সংস্কৃতিকর্মীকে বঞ্চিত করে অনেক জামায়াত- শিবির ঘরানার মানুষকে রাখা হয়েছে। যারা বাংগালী নয়, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী এই কমিটিতে তাদের আধিক্য এবং আধিপত্য লক্ষনীয় বলে মন্তব্য ওই পক্ষের।

এমন মন্তব্যের পর সভার সভাপতি এবং উদযাপন পরিষদের আহবায়ক আবুল মাল আবদুল মোহিত এই কমিটিকে ‘কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি কমিটি’ বলে উল্লেখ করে, কমিটিতে অনেকের নাম সংযোজন-বিয়োজনের বিষয়েও উপস্থিত সবাইকে আশ্বস্থ করেন। ওই সভার সিদ্বান্ত অনুযায়ী শীঘ্রই এ ব্যাপারে সভা করার মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে আরো একাধিক সংগঠন এবং প্রতিনিধিদের নাম যুক্ত করার সিদ্বান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্তের পর পরই উদযাপন পরিষদের কয়েক নেতার ইন্ধনে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলে। এই পক্ষটি সিসিক মেয়র এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের কমিটিতে রেখেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অনড় অবস্থান গ্রহণ করে।আর ওই পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন  আমিনুল ইসলাম লিটন এবং  মিশফাক আহমদ মিশু।

এই পক্ষের প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সিলেটের বিদগ্ধ একাধিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। কমিটিতে প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনের প্রতিনিধি যুক্ত এবং দেশজ সংস্কৃতির প্রতি বিরুদ্ধমত প্রদর্শণকারীদের বাদ দেওয়ার পক্ষে একাট্টা অবস্থান গ্রহণ করেন তারা। এমনকি কোনো দলীয়করণ নয়, শুধুমাত্র শুদ্ধ সংস্কৃতির ধারক এবং বাহকদের এই অভিযাত্রায় শামিল হবার আবেদন জানান তারা।

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র সংস্কৃতজন বলেন, বদর উদ্দিন আহমদ কামরান সিলেটের সংস্কৃতি অঙ্গণে যে অবদান রেখেছেন এবং পৃষ্টপোষকতা করেছেন, তাঁর সিকিভাগও করেননি মেয়র আরিফুল হক। অথচ, রাজনৈতিক তকমা দিয়ে কামরানকে এই কমিটি থেকে সরানোর মাধ্যমে মুলত : নিজেদের ফায়দা লোটের প্রচেষ্টা চলছে।

সিলেটের সর্বাপেক্ষা প্রাচীণ সাহিত্য সংগঠন সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংগঠন। রবীন্দ্র শতবর্ষ আয়োজন বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদের সাহিত্য সম্পাদক আবদুল মুকিত অপি বলেন, বিষয়টি আমরা শুনেছি। তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এতোবড় আয়োজন নি:সন্দেহে সিলেটেবাসীর জন্য গর্বের। কিন্তু সিলেটের একটি প্রাচীন সংগঠন হিসেবে এতোবড় মহাযজ্ঞে ‘কেমুসাস’কেও অবগত করার তাগিদ বোধ করেননি আয়োজকেরা-যা খুবই দু:খজনক।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিলেট শহিদমিনার বাস্তবায়ন পরিষদের নেতা এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এনামুল মুনির বলেন, এতোবড় একটি মহাযজ্ঞ আয়োজন সিলেট বাসীর জন্য একটি বিরাট গর্বের বিষয়। কিন্তু এই আয়োজনে উদযাপন পরিষদের পরিসর আরো বড় করার প্রয়োজন। তিনি বলেন, সিলেটে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনেককেই যেভাবে এই পরিষদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে,ঠিক একইভাবে বিভিন্ন পেশাজীবি সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এখানে উপেক্ষিত। তাছাড়া, রবীন্দ্র সংস্কৃতি বিরোধীরাও এই পরিষদের যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের আপত্তির বিষয় নিয়ে তিনি বলেন, অধিকাংশ নয় যেহেতু আহবায়কসহ কেউ এই আপত্তির সাথে দ্বীমত পোষন করেননি-তাই আহবায়ক বিকল্প সদস্য সচিবের নাম প্রস্তাব করতে বলেন। তখন ওই সভা থেকে অধ্যাপক বিজিত কুমার দে এবং উদীচীর সাবেক সভাপতি ব্যারি: আরশ আলীর নাম উঠে আসে প্রস্তাবে।

দু:খ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংগালি জাতীয়তাবাদের আবহমান ঐতিহ্যের ধারায় বিশ্বাসী অনেকগুলো সংগঠন এবং এই ধারার সংগঠন সমুহের আলাদা জোট সিলেটে সক্রিয়ভাবে কাজ করলেও তাদের কোনভাবে পর্ষদে সম্পৃক্ত বা অবহিত করা হয়নি।

একই অভিযোগ করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শামসুল বাসিত শেরো। তিনি বলেন, এই উপলক্ষ্যে ঘরোয়া পরিবেশে মদন মোহন কলেজে একটি সভা হয়। সেই সভায় আমি কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের নাম প্রস্তাব করলে ‘পলিটিক্যাল’ শব্দ বলে আমাকে থামিয়ে দেওয়া হয়। তখন আমি একই সভায় আয়োজক কমিটিতে যুক্ত একাধিক রাজনৈতিক ব্যাক্তির নাম ও পদবী তুলে ধরি। একপর্যায়ে উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহর উপস্থিতিতে উপদেষ্টা হিসেবে কমিটিতে কামরানের নাম অন্তর্ভুক্তির সিদ্বান্ত গৃহিত হয়। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য আজও সেই নাম নিয়ে জল ঘোলা করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে।

তবে, উত্থাপিত অভিযোগ মানতে নারাজ সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি মিশফাক আহমদ শিশু। তিনি বলেন, সিসিক মেয়রকে নগরীর অভিভাবক হিসেকে কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে। তাছাড়া, সিলেটে প্রতিনিধিত্বশীল কোনো সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিকে কমিটি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে মনে করেননা তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও ক্রীড়া সংগঠক বিজিত চৌধুরী বলেন, যেহেতু সিলেটে এতোবড় আয়োজনের মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে এবং এই আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সেখানে আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগর নেতৃবৃন্দের অনুপস্থিতি কোনো অবস্থাতেই শোভনীয় নয়। তাছাড়া, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসবেন হত্যা মামলার আসামী এবং মৌলবাদীদের পৃষ্টপোষক-এটা কিছুতেই মেনে নিবোনা।

তবে, মাননীয় সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং সিলেটের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আবুল মাল আবদুল মোহিত উদযাপন পরিষদের আহবায়ক থাকায় আমরা গর্বিত এবং আনন্দিত। তিনি বলেন, একটি চক্র আবুল মাল আবদুল মোহিতের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির নাম ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে নিজেদের ফায়দা ও ব্যক্তিগত সার্থ হাসিলের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।





পুরানো সংবাদ

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  


© All rights reserved © 2017 sylhetprotidin.com