l

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০২:৪৯ অপরাহ্ন


…তাহলে তো দাগই ভালো!

…তাহলে তো দাগই ভালো!

  • 4
    Shares

প্রভাষ আমিন :: এমনিতেও সফরটি ঐতিহাসিক। এই প্রথম ভারতে বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ সফর। অথচ বাংলাদেশ টেস্ট খেলছে ১৯ বছর ধরে। ২০০০ সালে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে অভিষেক টেস্টে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো টেস্টে টস করতে নামেন দুই বাঙালি- বাংলাদেশের নাঈমুর রহমান দুর্জয়, ভারতের সৌরভ গাঙ্গুলী। বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ক্ষেত্রেও দারুণ অবদান ছিল আরেক বাঙালি জগমোহন ডালমিয়ার। সত্যি কথা হলো, তখন মাঠের পারফরম্যান্সে কিছুটা এগিয়েই ছিল কেনিয়া। কিন্তু সাবের হোসেন চৌধুরীর দারুণ ক্রিকেট ডিপ্লোম্যাসি, জগমোহন ডালমিয়ার উষ্ণ বন্ধুত্ব, ক্রিকেটের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা আর গ্যালারিভরা দর্শককে পুঁজি করে কেনিয়াকে পেছনে ফেলে একটু আগেই টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে যায় বাংলাদেশ। আশা ছিল, বাংলাদেশের ক্রিকেটের এগিয়ে যাওয়া ও বিকাশে পাশেই থাকবে ভারত। কিন্তু এমনই বন্ধু ভারত, অভিষেক টেস্টে প্রতিপক্ষ হয়েই দায়িত্ব শেষ করে ভারত। তারপর গত ১৯ বছরে সহযোগিতা নয়, পদে পদে অসহযোগিতা পেয়েছে বাংলাদেশ। এই ১৯ বছরে ক্রিকেট খেলে এমন সব দেশই সফর করেছে বাংলাদেশ, কিন্তু পাশের দেশ ভারতেই কখনো যাওয়া হয়নি।

১৯ বছর পর ভারতে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সফরটি তাই এমনিতেই ঐতিহাসিক। কিন্তু সফরের আগের ১০ দিন বাংলাদেশ ক্রিকেটে যা যা ঘটল, তাতে এই সফর মহাঐতিহাসিক হয়ে গেছে। ক্রিকেট নিয়ে একটু খোঁজ-খবর রাখেন, বিশ্বের এমন সবাই জানেন, বাংলাদেশ তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সফরে ভারত যাচ্ছে। তবে সেই সফরে থাকছেন না বাংলাদেশের দুই সেরা খেলোয়াড় সাকিব এবং তামিম। এমনিতে ইনজুরি বা অফফর্মের কারণে না থাকলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু সাকিব যে কারণে নেই, তা যেকোনো দলের মনোবল গুড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। দলের সেরা খেলোয়াড়কে যখন জুয়াড়ির সাথে যোগাযোগের তথ্য গোপন করার অভিযোগে আইসিসি নিষিদ্ধ করে, তখন সেই দলের মোরাল শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। তামিম অবশ্য ছুটি নিয়েছেন। দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের সময় স্ত্রীর পাশে থাকতে চান। খুবই যৌক্তিক কারণ। কিন্তু তামিম প্রথমে শুধু দ্বিতীয় টেস্টের জন্য ছুটি চেয়েছিলেন।

সবচেয়ে বড় তারকা সাকিব আল হাসানই বাংলাদেশের মুখে কলঙ্কের সবচেয়ে বড় দাগটা দিয়েছেন। তবু আমরা সেই বিজ্ঞাপনের ভাষায় সান্ত্বনা খুঁজি- দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয়, তবে তো দাগই ভালো

আমার ধারণা দলের টালমাটাল অবস্থা দেখে অফফর্মে থাকা তামিম নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। সফরে বাংলাদেশ দুটি টেস্ট আর তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলবে। এই দুই ফরম্যাটেই বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন সাকিব। ফ্লাই করার আগের দিন বাংলাদেশকে অধিনায়ক বদলাতে হয়েছে, দলের কম্বিনেশন বদলাতে হয়েছে। এমন অবস্থায় অনেকের মনেই শঙ্কা ছিল বাংলাদেশ বুঝি ভারতের সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করবে। এমনিতেও শক্তির বিচারে ভারত অনেক এগিয়ে। তাছাড়া কদিন আগে শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকা ভারতে এসে যে নাকানিচুবানি খেয়ে গেছে, তাতে বাংলাদেশের গুড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়। কিন্তু সফরের প্রথম ম্যাচেই দূষিত নগরী দিল্লির অরুণ জেটলি (সাবেক ফিরোজ শাহ কোটলা) স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ যা করল তা দেখার মধ্যে পরম শান্তি আছে, দারুণ স্বস্তি আছে। ‘সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার/তবু মাথা নোয়াবার নয়।’

আসলে অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশ দলের সাফল্যের সূত্র পঞ্চপাণ্ডবে নিহিত। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি থেকে মাশরাফির অবসরের পর এই দুই ফরম্যাটে ছিল টপ ফোর। অনেকদিন ধরে আলোচনা, ফিসফাঁস- এই পঞ্চপাণ্ডব চলে গেলে বাংলাদেশের কী হবে? কারা হাল ধরবে? বিশেষ করে অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশ দল সাজানোই হচ্ছিল সাকিবকে ঘিরে। কখনো তিনি বল হাতে সেরা, কখনো ব্যাট হাতে; কখনো দুটোতেই। এমন একজন চ্যাম্পিয়ন, সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার দলে থাকলে অধিনায়ক নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারেন।

কিন্তু এটাও ঠিক সব ভালোরই শেষ আছে। পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে মাশরাফির ক্যারিয়ারে শুধু বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা বাকি। বাকি চারজনও বড়জোর চার বছর। তারপর তো বাংলাদেশকে নতুনের গান গাইতেই হবে। সেই গানটাই একটু আগে বেজে উঠল। বাবা মারা গেলে যেমন সন্তানরা একদিনেই বড় হয়ে যায়, তেমনি বাংলাদেশ ক্রিকেটও একদিনেই লায়েক হয়ে গেছে। বাবার অভাব পূরণ হওয়ার নয়, তবু বাবাকে ছাড়া চলতে হয়। তেমনি সাকিবের কোনো বিকল্প নেই, তবু তাকে ছাড়াই চলতে হবে, এটাই বাস্তবতা। যেমন প্রথম টি-টোয়েন্টিতে বল হাতে আমিনুল যা করেছেন, ব্যাট হাতে নাইম যা করেছেন; সাকিব একাই হয়তো তাদের চেয়ে অনেক ভালো করতেন। কিন্তু সাকিব দলে নেই এই বাস্তবতা মেনেই এখন আমাদের এগুতে হবে।

সাকিব যেমন বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বড় শক্তি, তেমনি সবচেয়ে বড় দুর্বলতারও নাম। সবচেয়ে বড় শক্তি কেন, সেটা তো সবাই জানে। কারণ সাকিব একাই একশ। গত বিশ্বকাপে দলীয় পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ তলানিতে, মানে অষ্টম। কিন্তু ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে সাকিব নাম্বার ওয়ান। দুর্বলতাটাও এখানেই। বাংলাদেশ এত বেশি সাকিবকেন্দ্রিক, সাকিবনির্ভর; অন্যদের দিকে কারও নজর থাকে না। নতুন বোলাররা সময়মতো বল পান না। দলে সাকিব থাকলে সবার মধ্যে একটা নিশ্চিন্ত, গাছাড়া ভাব থাকে- ও সাকিব তো আছেই। অবচেতন মনেই একটা ঢিলেমি চলে আসে। হঠাৎ করেই বাংলাদেশ দিশেহারা, সাকিব ছাড়াই সাঁতরাতে হবে অকূল পাথারে। এখন বাংলাদেশকে হয় ঘুরে দাঁড়াতে হবে; নয় ধ্বংস হয়ে যেতে হবে, ডুবে যেতে হবে। তরুণদের ধন্যবাদ, বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমন দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, দেখে বুক ভরে যায়।

গত ১৯ বছরে সহযোগিতা নয়, পদে পদে অসহযোগিতা পেয়েছে বাংলাদেশ। এই ১৯ বছরে ক্রিকেট খেলে এমন সব দেশই সফর করেছে বাংলাদেশ, কিন্তু পাশের দেশ ভারতেই কখনো যাওয়া হয়নি

একটু পিছিয়ে যাই- ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। শেষ ওভারে দরকার ছিল ১১ রান। ক্রিজে ছিলেন মুশফিক আর মাহমুদউল্লাহ। মুশফিকের দুই চারে জয় যখন আরও কাছে, তখনই ছক্কা মারার চেষ্টায় পরপর দুই বলে মুশফিক আর মাহমুদুল্লাহর আত্মহত্যায় শেষ তিন বলে ২ রানও করা হয়নি। একই রকম পরিস্থিতি ছিল রোববারের দিল্লি ক্ল্যাসিকেও। আবারও সেই মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ। ১৯তম ওভারের শেষ চার বলে টানা চার মেরে মুশফিক জয়টাকে দৃষ্টিসীমায় নিয়ে এলেন। কিন্তু ঘরপোড়া গরুর ভয় তবু যায় না। কিন্তু এবার অন্য বাংলাদেশ, লেখা হলো অন্য গল্প। চার বলে এক রান- এমন সমীকরণে দাঁড়িয়ে মাহমুদউল্লাহ যে ছক্কাটা মারলেন, তা চোখে ভালো লাগার আবেশ ছড়িয়ে দেয়, যা অনেকদিন ধরে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করা যায়। মাহমুদউল্লাহ বুঝিয়ে দিলেন, নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিতে তিনি তৈরি।

মুশফিকের ৪৩ বলে ৬০ রানেই জয় এসেছে বটে, তবে নাইমের ছক্কা, আমিনুলের টার্ন, আফিফের বাজপাখি হয়ে যাওয়াকে কিন্তু আপনি ভুলে যাবেন না। নতুনরা কিন্তু জানান দিচ্ছে, আমরা তৈরি। একসময় বিশ্ব ক্রিকেটে সবচেয়ে উত্তেজনাকর লড়াই ছিল ভারত-পাকিস্তান। গত একদশকে সেটা বদলে গেছে বাংলাদেশ-ভারতে। এ দুই দলের লড়াই মানেই উত্তেজনার বারুদে ঠাঁসা। কেন জানি মনে হয়, বাংলাদেশকে ভারত একটু ভয় পায়। আর সেই ভয় তাড়াতেই বাংলাদেশকে তারা অবহেলা করে, অবজ্ঞা করে। সামাজিক মাধ্যমে ট্রল তবু গ্রহণযোগ্য। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমে শেবাগের মতো সিনিয়র প্লেয়ার মডেল হয়ে যখন বাংলাদেশকে হেয় করতে নামে, তখন বুঝতে হবে; সমস্যা অন্য কোথাও। তবে সুখের কথা হলো শেবাগদের থোতা মুখ ভোঁতা করে দিয়েছে আফিফরা। বাকি সিরিজ কেমন কাটবে জানি না, কিন্তু প্রথম ম্যাচেই বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছে, বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী।

সাকিব না থাকাতে এখন বাংলাদেশকে নতুন করে টিম সাজাতে হবে, কম্বিনেশন বদলাতে হবে। নতুনদের ওপর দায়িত্ব অনেক বাড়বে। নতুনরা অনেক বেশি মনোযোগ পাবে। সবাইকে বুঝতে হবে বাংলাদেশ নিছক ওয়ান ম্যান আর্মি নয়। সাকিবের মতো খেয়ালি প্রতিভাবান কিন্তু পতিত রাজকুমারেই শেষ নয়। সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের টিম হিসেবে গড়ে ওঠার, এগিয়ে যাওয়ার। ক্রিকেট যে একজনের খেলা নয়, টিম গেম; সেটা বুঝিয়ে দেয়ার এখনই সময়। সবচেয়ে বড় তারকা সাকিব আল হাসানই বাংলাদেশের মুখে কলঙ্কের সবচেয়ে বড় দাগটা দিয়েছেন। তবু আমরা সেই বিজ্ঞাপনের ভাষায় সান্ত্বনা খুঁজি- দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয়, তবে তো দাগই ভালো।

লেখক- হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ।

সিলেট প্রতিদিন/এম/এ


  • 4
    Shares




পুরানো সংবাদ

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  


© All rights reserved © 2017 sylhetprotidin.com