বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ০৯:২৮ অপরাহ্ন


নৃবিজ্ঞান ও বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা

নৃবিজ্ঞান ও বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা

  • 752
    Shares

জাভেদ কায়সার : আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করার ৬ বছর পূর্ণ হলো। ২০১৩ সালে লাফাতে লাফাতে বাংলাদেশে আসলাম মাস্টারি করার স্বপ্ন নিয়ে। সুইডেনে থেকে যাওয়ার সকল দরজাই খোলা ছিল, তারপরেও মাস্টারি করার লোভটা সামাল দিতে পারিনি। দেশে ফেরার পর ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল এ চাকুরী হলো, সিয়েরা লিওনে পোস্টিং, অনেক সেলারিতে, সেটাও ছেড়ে দিলাম! অনেকটা কাকতালীয় ভাবেই শাবিপ্রবি’র মাস্টার হলাম! সেই স্বপ্ন পূরণ হলো, কিন্তু বাস্তবতা স্বপ্নের চেয়ে অবশ্যই আলাদা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান যে মান, তা পরিসংখ্যান না দেখেই অনুমান করা যায়, ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সকলেই ‘ক্ষমতা’ অন্বেষণে ব্যস্ত, সেখানে জ্ঞান উৎপাদনে কার মন নিবিষ্ট হবে? এক দিকে চরম অনিরাপত্তার ছড়াছড়ি চারিদিকে, সবাই নিজের আখের গুছাতে ব্যস্ত। যে যেভাবে পারে নিজের সঞ্চয় যত বড় করা যায়, সেই দিকে নজর দিচ্ছে, কারণ, বিপদ হলে দেখা কেউ নেই। তাই অর্থ উপার্জন এখন একমাত্র ও প্রধানতম কাজ বলে বিবেচিত।

অন্যদিকে ক্ষমতা না থাকলে কোন কাজই হয় না এই দেশে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় সকলের গাড়িতে যে যার পরিচয়ের একটা লোগো লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়, যার লোগো নাই, তিনি যদি দামী গাড়ি ব্যবহার করেন, সেটা আবার লোগোর চেয়েও অনেক জায়গায় বেশি কাজ দেয়।

এমন বাস্তবতার দেশে, নৃবিজ্ঞান পড়তে আসা অনেকের কাছে দুঃস্বপ্নের মত। একটা সার্টিফিকেট লাগবে, তাই এই বিভাগে ভর্তি হয় শতকরা ৯০% শিক্ষার্থী, যাদের কোন ধারণাই থাকেনা এই বিভাগে আসলে কি পড়ানো হয়। শঙ্কার একটা বড় কারণ, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে এর কোন জায়গা নেই। তাহলে এইটা পড়ে কি হবে? অন্যদিকে এই সেক্টরে যে কাজ পাওয়া যায়, যে মানের গবেষক হওয়া যায়, তা মূল ধারার অনেক শিক্ষিত মানুষই বোঝেন না, ইন্টার পাশ শিক্ষার্থী তো দূরের কথা। এমন বাস্তবতায় যারা পড়তে আসেন, তাদের এই বিভাগের প্রতি কোন প্রেম অন্তত প্রথম এক বছর জন্মায় না! এর পরে কেউ কেউ একটু একটু করে আগ্রহী হন, কিন্তু মোটা দাগে সবাই বিসিএস এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন, নিজের আসল কাজ বাকি রেখে। এই ঝামেলাটা আরো তীব্র হয় যখন আপনি একটা ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন কিংবা পড়ান। কারণ এখানে সবাই ‘ইঞ্জিনিয়ার’ এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের যে দুনিয়া ব্যাপী আলাদা মূল্যায়ন আছে তা এখানে খাটে না। নামে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু এখানে সকল ধরনের সাবজেক্ট পড়ানো হয়, আবার পিএইচডি ডিগ্রীও দেয়া হয়, কিন্তু এখানে দর্শন এবং ইতিহাস বিভাগ নেই। তাহলে সহজেই বুঝা যায়, এই (ধরনের) বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম আসলে জ্ঞান উৎপাদন না বরং কিছু দক্ষ শ্রমিক উৎপাদন করা। আর যারা সত্যিকারে জ্ঞান উৎপাদন করছেন শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী তারা উভয়ই নিজ চেষ্টায়, নিজ মেধায় করছেন, তার সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলিত সিস্টেমের খুব বেশি যোগাযোগ নেই বলেই আমার ধারণা।

সবাই চায় একটা ‘নিরাপদ’ চাকুরী, এর জন্য সবচেয়ে বেশি ভাল হচ্ছে সরকারী চাকুরী। এই দেশে যেহেতু কথায় আছে সরকারি চাকুরী একবার পেলে আর যায় না, সেহেতু এই খাতায় নাম লিখাতে পারলে আর কোন টেনশন নাই, কারণ দিন শেষে আমরা বড় গলায় কথা বললেও চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পাই। তাই শিক্ষার্থীরাও সার্টিফিকেট সন্ধানে এই বিভাগে দুর্ভাগ্যক্রমে আছাড় খেয়ে পড়ে এবং তাদের অনিচ্ছায় তাদের নিয়ে ৫ বছরের যাত্রা শুরু হয়। দেশে যে পরিমাণ উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হচ্ছে, তাতে যাদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, এবং তা থেকে উৎপাদিত ‘মেধা’ দেশের কি কাজে লাগবে তা আগামী ২০ বছরের মধ্যেই খুব ভাল করে টের পাওয়া যাবে।

শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে দোষ চাপানোর আগে আমাদের নিজেদের দিকেও তাকানো উচিত! আমরা এমন এক পেশায় আছি, যেখানে নিজেরা নিজেদের ঈশ্বরের কাছাকাছি মনে করি, এবং শিক্ষার্থীদের যে মূল্য আছে তা অনেক সময়ই ভুলে যাই। আমার পছন্দ না হলে কোন শিক্ষার্থীকে আমরা নানাবিধ ভাবে ‘দেখে’ নেই, এটা এই বিশ্ববিদ্যালয় না বরং সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য নজির আছে। নানা কারণে আমরা পছন্দ-অপছন্দের সমীকরণ তৈরি করি, যা আমাদের করা উচিত কিনা তা নিয়ে আমার নিজের-ই প্রশ্ন আছে।

আবার শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে- যারা উচ্চ শিক্ষায় আসছেন, তাদের গড়পড়তায় অবস্থা কেমন? যারা বিজ্ঞানের সাবজেক্ট গুলোতে যাচ্ছেন, তারা অধিকাংশই ‘ভাল’ স্কুল কলেজ থেকে ‘ভাল’ রেজাল্ট করে আসছেন, এবং তুলনামূলক ভাবে ‘কম ভাল’রা সমাজ বিজ্ঞান অনুষদে আসেন, এবং সবচেয়ে অনিচ্ছায় নৃবিজ্ঞান বিভাগে আসেন। অনেকে আবার মাইগ্রেয়াশন করে অন্য বিভাগে যাওয়ার পর বুঝেন কী ভুলটাই না তারা করলেন, কত কাজের সুযোগ আছে এই বিভাগে পড়ালেখা করে। যাই হোক, সেই সকল শিক্ষার্থীদের ‘দক্ষ’ গবেষক করে তোলার জন্য অনেক বাড়তি পরিশ্রমের দরকার, যা আবার আমরা দিতে নারাজ। এখানে আগত শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আসার নূন্যতম সীমানা থাকে, কিন্তু আসার পর যখন দেখা যায় তারা বাংলা বা ইংলিশ কোন ভাষাতেই শুদ্ধ করে কিছু লিখতে পারেনা, তখন বুঝতে হয়, সমস্যাটা আসলে অন্য জায়গায়। এদের ধরে ধরে আমরা নষ্ট করে দিয়েছি, এবং দিচ্ছি।

একটা রাষ্ট্রের যদি ভাল কিছু আশা করেন, তবে সেই রাষ্ট্রের শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে। কিন্তু আমরা উপরের দিকে হয়ত কিছুটা নজর দিচ্ছি, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বেশি নজর দেয়া উচিত প্রাথমিক শিক্ষাতে। সেখানে অনেক উচ্চ শিক্ষিত ও দক্ষ শিক্ষক দিয়ে বাচ্চাদের পড়াতে হবে। এই প্রথম ৫ বছর শিক্ষা জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই আপনি হিংসা বিদ্বেষ শেষ করে দিতে পারেন, যদি আলাদা আলাদা মাধ্যমে না পড়িয়ে সবাইকে একই সিলেবাসে পড়ান, ধনী, গরিব, ধর্ম, বর্ণ নির্বিষেশে একই শিক্ষা দান করলে পারষ্পারিক হিংসা বিদ্বেষ অনেকাংশেই কমবে এবং একটা ভাল জাতি পেতে পারেন। গোঁড়ায় নজর না দিয়ে, উপরে যতই পানি ঢালি তাতে খুব একটা লাভ হবেনা। এখানে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থী আছে, যাদের অধিকাংশই নিজ গুনে প্রকাশিত। তখন নিজ ইচ্ছায় যদি নৃবিজ্ঞান পড়তে আসে, অবশ্যই অনেক ভাল গবেষণা সম্ভব হবে এবং দেশে ফিরে আসাগুলো সার্থক হবে।

লেখক : জাভেদ কায়সার ইবনে রহমান
সহকারি অধ্যাপক,
নৃবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

সিলেট প্রতিদিন/এমজে


  • 752
    Shares




পুরানো সংবাদ

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  


© All rights reserved © 2017 sylhetprotidin.com