সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন


বঞ্চিত মিসবাহ সিরাজ

বঞ্চিত মিসবাহ সিরাজ

  • 2.9K
    Shares

প্রতিদিন ডেস্ক : অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। ছাত্রলীগের কর্মী থেকে টানা তিনবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোশতাকে গণপিঠুনি দেয়া সিলেটের মিসবাহ সিরাজ সৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিরোধী আন্দোলনসহ সকল আন্দোলনে ছিলেন সামনের সারিতে।

ওয়ান ইলেভেনে তথাকথিত সংস্কারের অনেক নেতার আদর্শচ্যুতি ঘটলেও মিসবাহ সিরাজ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অবিচল ছিলেন। তবে দুর্দিনে দলের সঙ্গে থাকলেও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে অনেকটা বঞ্চিত মিসবাহ সিরাজ।

সদ্য সমাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে দলীয় কোনও পদ পাননি তিনি। এতে হতাশা বেড়েছে আওয়ামী লীগের তৃনমুলের নেতাকর্মীদের। তবে তাদের আশা, দুর্দিনে দলের কর্মী মিসবাহ সিরাজকে শেখ হাসিনা মর্যাদার আসনে বসিয়ে মুল্যায়ন করবেন।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানান, ১৯৮৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী খন্দকার মোশতাক সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠে জনসভা করতে আসলে তাকে প্রতিহতের ঘোষনা দেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সেসময় তৎকালীন সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মোশতাকের জনসভা পন্ড করে দেন। পুড়িয়ে দেয়া হয় মোশতাকের জনসভা মঞ্চ। পরে গণপিঠুনি দিয়ে তাকে সিলেট ছাড়া করা হয়। এরপর একইস্থানে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের সভাপতিত্বে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ ঘটনার দিন ভোরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেসময় দীর্ঘ ১৭ মাস কারাভোগের পর তিনি মুক্তি পান।

জানা যায়, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ১৯৭৭ সালে মদন মোহন কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। সাংগঠনিক দক্ষতায় অল্প সময়ের মধ্যে তিনি মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন, পরে সভাপতিও হন তিনি। ১৯৮১ সালে বৃহত্তর সিলেটের চার জেলার সমন্বয়ে গঠিত সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৮৩ সালে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হন তিনি। একই সঙ্গে তিনবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ছাত্রজীবন শেষে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পন।

পরবর্তী সময়ে ২০০২ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দুইদফা সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি টানা তিনবার আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন।

পেশাগত জীবনে মিসবাহ সিরাজ ১৯৯২ সালে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সিলেটের স্পেশাল পিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি ২০০৪ সাল এবং ২০০৮ সালে দুই মেয়াদে বার কাউন্সিলের সদস্য ও ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সিলেটের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মিসবাহ সিরাজ বৃটিশ রাষ্ট্রদুত আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে দোষীদের দন্ড প্রদানে ভূমিকা রাখেন।

এছাড়া বিডিআর বিদ্রোহ মামলা, শিশু রাজন হত্যা মামলা, কলেজ ছাত্রী খাদিজা হত্যাচেষ্টা মামলা, দিরাইয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের উপর বোমা হামলা মামলা, গুলশান সেন্টারে গ্রেণেড হামলা মামলাসহ সিলেটের আদালতে সবগুলো চাঞ্চল্যকর মামলাতেই রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি হিসেব যোগ্যতার সাক্ষর রেখেছেন।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, প্রায় ৪৫ বছর ধরে সর্বস্ব উজাড় করে দলের সেবা দিয়ে চলছেন মিসবাহ সিরাজ। হামলা-মামলা জেল-জুলুম সবকিছু উপেক্ষা করে মাঠে ছিলেন তিনি। জঙ্গিরা কাফনের কাপড় পাঠিয়ে তাকে হুমকি দিয়েছিল।

২০০৪ সালের ৭ আগষ্ট সিলেটের গুলশান সেন্টারে জঙ্গিদেও গ্রেণেড হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরবর্তী সময়ে ১২ আগষ্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে দেখতে সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালের আসেন। নেতাকর্মীদের দাবি, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে দল তাকে মুল্যায়ন করবে।

হবিগঞ্জ জেলা আওযামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোশতাককে সিলেটে গনপিঠুনি দিয়েছিলেন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। ওয়ান ইলেভেনে অনেকে চাপের পরও তিনি দলের হয়ে মাঠে ছিলেন। নেতাকর্মীরা তাকে সবসময় পাশে পায়।

ছাতক পৌরসভার মেয়র আবুল কালাম চৌধুরী বলেন, আব্দুস সামাদ আজাদ, দেওয়ান ফরিদ গাজি, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মারা যাওয়ার পর সিলেট এখন জাতীয় নেতাশুণ্য। মিসবাহ ভাই তৃণমুলের নেতাকর্মীদের একমাত্র ভরসাস্থল।

মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, আওয়ামী লীগে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের অনেক অবদান রয়েছে। দলের জন্য তার ত্যাগ ও অবদান মুল্যায়ন করে দল তাকে আরও বড় পদে দায়িত্বে দিবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি নুরুল হুদা মুকুট বলেন, আমি যখন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম তখন মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ছিলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তাকে নিয়ে আমি সুনামগঞ্জের প্রতিটি উপজেলায় আওয়ামী লীগের সম্মেলন করেছি। তিনি আমাদের অনেক সহযোগীতা করেছেন। এমনকি অনেক চাপ সুপারিশ উপেক্ষা করে তিনি প্রতিটি কমিটি গঠনে আমাদের সহযোগীতা করেছেন। তৃণমুলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা তাকে দল মুল্যায়ন করবে।

সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা জেবুন্নেসা হক বলেন, মিসবাহ সিরাজ দীর্ঘদিন দলের সঙ্গে আছেন। দলের দুর্দিনে তিনি ছিলেন সবার সামনের সাড়িতে। দলের কঠিন সময়ে অনেকে বেইমানি করলেও মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ আদর্শচ্যুত হননি। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা তাকে বার বার মুল্যায়ন করেছেন। আগামীতেও তাকে মুল্যায়ন করা হবে আশা করি।

সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ দলের ত্যাগী কর্মী। সারাজীবন তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের বিপদে আপদে ছিলেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, প্রায় ৪৫ বছর ধরে দলের আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করছি। কোনও সময় হামলা, মামলা, ভয়ভীতি আমাকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। দলের পদ-পদবী পেলাম কিনা সেটা বিষয় নয়। দলের প্রয়োজনে মাঠে ছিলাম, মাঠেই থাকবো।


  • 2.9K
    Shares






© All rights reserved © 2017 sylhetprotidin.com