বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:৩৭ অপরাহ্ন


ইলিশের উৎপাদনশীলতা নিয়ে শাবি ও চবি শিক্ষকের সমন্বয়ে গবেষণা

ইলিশের উৎপাদনশীলতা নিয়ে শাবি ও চবি শিক্ষকের সমন্বয়ে গবেষণা

  • 469
    Shares

প্রতিদিন প্রতিবেদক :::

বঙ্গোপসাগরে প্রাথমিক উৎপাদনশীলতার সাথে ইলিশের প্রাচুর্যতার সম্পর্কঃ

ইলিশ মাছ (Tenualosa ilisha) মানুষের জীবিকার সংস্থান, খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে, যদিও ইলিশের জীবনচক্র-ভিত্তিক আবাসস্থল এবং পরিবেশগত নিয়ামকমসূহের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক অনেকটাই অজানা রয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস এবং শাহজালার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ এর গবেষকবৃন্দ বঙ্গোপসাগরের প্রাথমিক উৎপাদনশীলতার সাথে ইলিশের প্রাচুর্যতার সম্পর্ক চিহ্নিত করেছেন।

গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালনা করেন অধ্যাপক ড. মোঃ শাহাদাত হোসেন, ড. সুব্রত সরকার, অধ্যাপক ড. এস.এম. শরীফুজ্জামান এবং অধ্যাপক সাইদুর রহমান চৌধুরী। Nature Group কর্তৃক প্রকাশিত Scientific Reports  নামক আন্তর্জাতিক জার্নালে এই গবেষণার পূর্ণ প্রতিবেদন ইতোমধ্যে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধাকাওে প্রকাশিত হয়েছে।

মানচিত্রে উত্তর বঙ্গোপসাগরে ইলিশের জীবনচক্র, আবাসস্থল এবং চলাচলের বিস্তৃতি-

সামুদ্রিক খাদ্যচক্রের মূলভিত্তি হলো উদ্ভিদকণা বা ফাইটোপ্লাংটন, যা বৈশ্বিক প্রাথমিক উৎপাদনের প্রায় ৫০% যোগান দেয় এবং সমুদ্রের পরিবেশগত, জীবজগত সম্পর্কিত ও প্রান-রাসায়নিক প্রক্রিয়াসমূহ সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উপরন্তু, সামুদ্রিক উদ্ভিদকণা বছওে ৩০-৫০ বিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বন সংরক্ষন কওে, যাহা পৃথিবীর মোট কার্বনের ৪০-৫০ শতাংশের সমতুল্য। অপরপক্ষে, প্রাণিকণা বা জুপ্লাংটন এবং তৃনভোজী মাৎস্য প্রজাতিসমূহ খাদ্যেও জন্য সরাসরি উদ্ভিদকণার উপর নির্ভরশীল। সর্বোপরি, প্রাথমিক উৎপাদনশীলতা সমুদ্রের উপরিস্তরের মাৎস্য সম্পদেও প্রাচুর্যতা, প্রজনন, বিচরণ এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রন কওে এবং এই মাৎস্য সম্পদই মানুষের খাদ্য, আমিষ, জীবন ও জীবিকার অন্যতম উৎস। পৃথিবীর মোট ইলিশ উৎপাদনের মধ্যে ৭৬% আহরন কওে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে, যেখানে মায়ানমার ১৫% এবং ভারত ৪% আহরণ করছে। অবশিষ্ট ৫% ইলিশ আহরণ করছে ইরাক, ইরান, কুয়েত, থাইল্যান্ড এবং পাকিস্থান, যদিও মালয়েশিয়ায় ইলিশের উপস্থিতি সনাক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জলরাশি থেকে সিংহভাগ ইলিশ (৭২%) আহরিত হয়ে থাকে এবং নদী-মোহনা অঞ্চল থেকে আসে সিকিভাগ। বিগত তিন দশকে বাংলাদেশে ইলিশের আহরণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ২০১৭-১৮ সালে ৫১৭,০০০ টন আহরিত হয়েছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১৬৮০ কোটি টাকা এবং এই সেক্টওে ৫ লক্ষ জেলে ও ২৫ লক্ষ মানুষের জীবিকার সংস্থান হয়েছে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর গবেষণা সংস্থা National Oceanic and Atmspheric Administration(NOAA) থেকে ১৯৯৮-২০১৮ সালের প্রাথমিক উৎপাদনশীলতা, পুষ্টি উপাদান এবং জুপ্লাংটন বিস্তৃতির তথ্য সংগ্রহ কওে এই গবেষণায় সমগ্র বঙ্গোপসাগরের ৩.৫৬৮ লক্ষ বর্গ কি.মি. এলাকা বিশ্লেষন করা হয়েছে। একইসাথে বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ উৎপাদন তথ্য ১৯৮৩-২০১৮ সংগ্রহ করা হয়েছে। সমগ্র বঙ্গোপসাগরকে তিনটি উৎপাদনশীল অঞ্চলে শ্রেণীবিভাগ করা হয়েছে, যথা (ক) সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল অঞ্চল >২০০০ মি.গ্রাম কার্বন/বর্গ মি./দিন, (খ) মাঝারী উৎপাদনশীল অঞ্চল ৫০০-২০০০ মি.গ্রাম কার্বন/বর্গ মি./দিন এবং (গ) সর্বনিম্ম উৎপাদনশীল অঞ্চল <৫০০ মি.গ্রাম কার্বন/বর্গ মি./দিন। প্রাপ্ত ফলাফলের শুদ্ধতা পরীক্ষার জন্য বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, ফিসবেস, আইইউসিএন, জিপ এবং শেড ফাউন্ডেশান কর্তৃক প্রণীত মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষনের সাথে ইলিশের বিচরণ চিত্রের তুলনা করা হয়েছে। একইসাথে, ১৯৫৬-২০১৯ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর ও তদসংলগ্ন উপকূল, মোহনা, নদী ও অন্যান্য জলরাশিতে পরিচালিত গবেষণা, পর্যবেক্ষন ও সমুদ্র অভিযানে প্রাপ্ত তথ্যেও তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের প্রাথমিক উৎপাদনশীলতার সাপেক্ষে ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বাভাস ও নির্দেশনা প্রণয়নে এই গবেষণার ফলাফল সহায়ক হবে।

 

ব্যাপক বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষনে প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী বাংলাদেশ সংলগ্ন মেঘনা অববাহিকা ও মায়ানমারের ইরাবতী অববাহিকার ০.১৩১-০.২১৩ লক্ষ বর্গ কি.মি. সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল অঞ্চল হিসেবে চিহিৃত করা হয়েছে। একইভাবে, মাঝারী উৎপাদনশীল অঞ্চল হিসেবে উপরোক্ত অববাহিকাসমূহ ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম সীমান্তবর্তী (ভারত উপকূল সংলগ্ন) এবং পূর্ব সীমান্তবর্তী (বাংলাদেশ-মায়ানমার-থাইল্যান্ড উপকূল সংলগ্ন) ০.৩৭৩-০.৮৬১ লক্ষ বর্গ কি.মি. এলাকা চিহিৃত হয়েছে। অপরদিকে, গভীর ও দূর সমুদ্রের ২.৫১৭-৩.০৪০ লক্ষ বর্গ কি.মি. সর্বনিম্ম উৎপাদনশীল এলাকা হিসেবে চিহিৃত হয়েছে। পুষ্টি উপাদানের মধ্যে সিলিকেট-এর অত্যাধিক ঘনত্ব গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা ও ইরাবতী অববাহিকাসহ উত্তর বঙ্গোপসাগরজুড়ে বিরাজমান। অপরদিকে, ইরাবতী অববাহিকার তুলনায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় নাইট্রেট ও ফসফেট এর সমৃদ্ধতা অনেক বেশী। বঙ্গোপসাগরের মেঘনা অববাহিকায় উদ্ভিদকণার প্রাচুর্যতা দু’মৌসুমে পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রথমত: আগষ্ট-নভেম্বর মৌসুমে উদ্ভিদকণার প্রাচুর্যতা সর্বেচ্চ ইলিশ আহরণের সাথে সম্পর্কিত এবং এসময়ে বছরের প্রায় ৮০% ইলিশ ধরা পড়ে।   দ্বিতীয়ত: জানুয়ারী-মার্চ মৌসুমে উদ্ভিদকণার প্রাচুর্যতা ইলিশের জাটকা বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কাজেই, বঙ্গোসাগরের নদী অববাহিকা অঞ্চলে পুষ্টি উপাদান ও উদ্ভিদকনার প্রাচুর্যতা জলীয় খাদ্যচক্রের বিভিন্ন ট্রপিক পর্যায়ে জীব-যোগাযোগের সুষম বিন্যাস নিশ্চিত করনের মাধ্যমে পারস্পরিক প্রজনন, খাদ্য আহরণ, বিচরণ ও অবাধে চলাচলের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলেছে। আবার, প্রাণিকণা বা জুপ্লাংটনের স্থানিক বিস্তৃতি মেঘনা ও ইরাবতী অববাহিকায় সর্বোচ্চ পরিলক্ষিত হয়েছে, যেখানে বঙ্গোপসাগরের পশ্চিম এবং পূর্ব সীমান্তবর্তী অঞ্চলে প্রাণিকণা ক্রমাগত হ্রাস পেয়েছে। তবে মধ্য ও দক্ষিন বঙ্গোপসাগর প্রাণিকণার উপস্থিতি সর্বনিম্ম পরিলক্ষিত হয়েছে। তাছাড়া জেলেদের পেশাগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে মোহনা এবং উপকূলীয় অগভীর সমুদ্র অঞ্চলে ইলিশের আধিক্য বেশী থাকে। এজন্য জেলেরা উপকূল হতে ৮০ মিটার গভীরতা ও ২০০ কি.মি. দূরত্বেও মধ্যে ইলিশ ধরার জাল ব্যবহার কওে থাকে, যদিও ৪০ মিটার গভীরতার মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমান ইলিশ ধরা পড়ে।

 

ইলিশ সাধারণত নদী ও সমুদ্রে গমনাগমনের মাধ্যমে জীবনচক্র সুসম্পন্ন করে এবং উদ্ভিদকণা, প্রাণিকনা, মাছের পোনা, প্রোটোজোয়া, ছোট ক্রাস্টাশিয়া ও শামুক-ঝিনুক খেয়ে জীবন ধারন করে। মোহনা অঞ্চলের উপযুক্ত পরিবেশ ও খাদ্যের প্রাচুর্যতা ইলিশের পোনা ও জাটকা বেড়ে উঠার উপযোগী হওয়ায় অক্টোবর-নভেম্বর মাসে প্রধান প্রজনন সংঘটিত হয়ে থাকে। ইলিশের পোনা ও জাটকা খাদ্য হিসেবে জুপ্লাংটন পছন্দ করে এবং বড় হওয়ার সাথে সাথে ফাইটোপ্লাংটন খাওয়ার দিকে ধাবিত হয়। পরিণত ও পূর্ণতাপ্রাপ্ত ইলিশের খাদ্য উপকরনে ৯৭-৯৮% ফাইটোপ্লাংটন এবং মাত্র ২-৩% জুপ্লাংটন অন্তর্ভূক্ত থাকে। প্রজননত্তোর ইলিশ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে গমন করে এবং পূন:পূর্ণতাপ্রাপ্তির জন্য সমুদ্রে বিচরণ করে।  মেঘনা অববাহিকার নদ-নদী ও উপকূলবর্তী অগভীর অঞ্চলে মার্চ পর্যন্ত ইলিশের জাটকা বিচরণ করে এবং বেড়ে উঠে। তবে অ্যানাড্রোমাস চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অত্যাবশ্যকীয় ধাপ হিসেবে ইলিশের ঝাঁক সমুদ্রমূখী যাত্রা শুরু করে এপ্রিল মাসে এবং দৈনিক ৭১ কি.মি. গতিবেগে উপকূল হতে প্রায় ২৫০ কি.মি. পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পরিণত ও পূর্ণতাপ্রাপ্তির জন্য ইলিশ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করে এপ্রিল-জুলাই পর্যন্ত এবং তারপর নদী-মোহনা মূখী প্রজনন যাত্রা শুরু করে। গভীর ও দূর সমুদ্রে ইলিশের উপস্থিতি ও বিচরণ পর্যবেক্ষন এবং আহরণের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারনে সমুদ্রমূখী বিস্তৃতি নির্নয় ও চলাচলের গতিপথ সনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি। কাজেই, সমন্বিত ও বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে ইলিশের জীবনচক্র-ভিত্তিক স্থানিক ও পার্থিক আবাসস্থল, বিচরণের বিস্তৃতি ও চলাচলের গতিপথ নির্ধারণ অতীব প্রয়োজন।

মানচিত্রে উত্তর বঙ্গোপসাগরে ইলিশের জীবনচক্র, আবাসস্থল এবং চলাচলের বিস্তৃতি-


  • 469
    Shares






© All rights reserved © 2017 sylhetprotidin.com