রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০২:৫৪ অপরাহ্ন


অভিবাদন- হে উত্তরণের কবি- সুর্য্যদয়ের, সূর্য্যবংশের কবি দিলওয়ার

অভিবাদন- হে উত্তরণের কবি- সুর্য্যদয়ের, সূর্য্যবংশের কবি দিলওয়ার

  • 5
    Shares

দিলু নাসের

বিশ্বখ্যাত লেখক ম্যাক্সিম গোর্কীর একটি উল্লেখযোগ্য উক্তি হলো শিল্পী “সাহিত্যিকরা হচ্ছেন তাঁর দেশ ও সমাজের চক্ষু,কর্ণ এবং হৃদয়। তিনি যথাসাধ্য সব কিছু জানবেন এবং দেখবেন ,তবে একজন শিল্পী সাহিত্যিককে দেশ জাতি, মাটিও মানুষের একাত্মতায় সম্পৃক্ত এবং জনতা প্রবক্তা হতে হলে তাকে মিশে থাকতে হয় জনতার মধ্যে । শ্বাস প্রশ্বাসে গ্রহন করতে হয় শ্রমজীবির ঘামে ভেজা বলিষ্টতা।

গোর্কীর এই উক্তির সাথে গত অর্ধ শতাব্দিকাল ধরে বাংলা সাহিত্যে যার কাব্যকলা সম্পৃক্ত, দেশ মাটি ও গনমানুষের একাত্মতায় যার শিল্পকলা সমর্পিত ,জীবনবোধ মানবতাবোধ ও বাস্তব সমাজ চেতনার আবহে যার কাব্যকলা উচ্চকিত , আধুনিক বাংলা কাব্যে যিনি ব্যক্তিত্ব সম্পন্য এক ,একক এবং অনন্য ,যার নির্ভীক কবিকন্ঠ ছিলো প্রগতি বিরোধী রাষ্টযন্ত্র, ধর্মীয় মৌলবাদ ,সাম্প্রদায়িকতা , এবং মানবতা বিরোধী সকল কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার । যিনি ছিলেন সারা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের বিবেকীও প্রতিবাদী কন্ঠস্বর , উত্তরণের কবি , যার কবিতায় উচ্চারিত হয়েছিলো—-
যাদের চোখের মনি জ্বলে উঠে, রাত পোহাবার আগে
পৌছে দিতে পৃথিবীর কথা সূর্য্যের পুরো ভাগে
শ্রমজীবি সেই মহামনবের রক্ত গোলাপ হাতে
ছড়িয়ে দিলাম আমার কবিতা নিদ্রাবিহীন রাতে ।

বাঙালীর স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা , ৭১ থেকে আজোবদি প্রতিটি সংগ্রামে , প্রতিটি বিপ্লবে যার কবিতা ,গান সহ অসংখ্য রচনা ভান্ডার আমাদের কাছে জীবনের প্রতিক, বাঁচার প্রতিক , প্রাণের প্রতিক । শব্দ চেতনায় যিনি বার বার আমাদের জীবন স্বত্তাকে জাগিয়ে দিয়েছেন , খুলে দিয়েছেন প্রগতির দুয়ার , দেশের দু:সময়ের তীমির অন্ধকারে যিনি উচ্চারণ করেছেন —-
অরুনিমা দিন আনো কষিত সোনার মতো দিন
দীপ্তির সমুদ্র গর্ভে নীশিত পিপাসা হোক লীন ।

পঞ্চাশ দশকের বাংলা কাব্য সাহিত্যের সেই প্রবাদ পুরুষ , আমাদের হিরন্ময় ইতিহাসের সূর্য্য সন্তান , অমৃতের বরপুত্র ,গণমানুষের কবি দিলওয়ার । তাঁর কবিতা কালের সাক্ষী হয়ে চির ভাস্বর, তার কলম ছিলো নিরন্তর চলমান । দীর্ঘ জীবনের ঘাতপ্রতিঘাতে বল্লবিদ্ধ হয়ে তিনি অবিচল থেকেছেন নিষ্টায়। স্বদেশ সমকাল ,মানবতাও নিসর্গকে সহযাত্রি করে তিনি পাড়ি দিয়েছেন জীবনের মহত্তর পথ ।

ভাষা আন্দোলন সহ বাঙালীর প্রতিটি হিরন্ময় অর্জন তাঁর রচনায় চিত্রিত হয়েছে । মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে তাঁর যে সব কবিতা গীত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে প্রেরণা যুগিয়েছে এর মধ্যে অন্যতম হলো —-
আয়রে চাষী মজুর কুলি , মেথর, কামার কুমার
বাংলা ভাষা ডাক দিয়েছে , বাংলা তোমার আমার ।

দিলওয়ার শুধু বাঙালীর কবি নন , মানচিত্রেরে সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর খ্যাতি বিশ্ব ব্যাপি । তিনি সারা বিশ্বের নির্যাতিত নীপিড়ীত মানুষের কবি , তাঁর ভাষায় —
পৃথিবী স্বদেশ যার আমি তার সঙ্গী চির দিন —।

তাঁর অসংখ্য কবিতা প্রয়াত ড,কবির চৌধুরী, কবি নুরুল হুদা ,ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সহ অনেকের দ্বারা ইংরেজিতে অনুদিত হয়েছে , আমার বিশ্বাস তাঁর নাম্ও একদিন , হোমার ,শেক্সপিয়র , গ্যাটে, টুর্গেনিভ, গোর্কী , এবং পাবলো নেরুদার মতো বিশ্ব নন্দিত হবে ।

কবি তাঁর নিজের সর্ম্পকে বলতে গিয়ে বলেন — “নিজের সম্পর্কে বলা আমার কাছে এক ধরনের বেদনাদায়ক ব্যাপার । পৃথিবী নিজের সর্ম্পকে কিছু বলেনা বলেই তার মহত্ত ও সৌন্দর্যের শেষ নেই । আমি তো সেই অনন্য পৃথীবিরই সন্তান ”। কবি তার নিজের সম্পর্কে কিছু বলেননা বলেই তাঁর রচনা তাঁকে পৌছে দিয়েছেছিলো খ্যাতির শিখরে , তিনিই বোধহয় বাংলাদেশের একমাত্র লেখক যিনি মফ:স্বলে বসেই বাংলা একাডেমি পদক , একুশে পদক সহ দেশের রাষ্টিয় বিভিন্ন সম্মানে ভুষিত হয়েছেন । যুগের প্রতিধ্বনি এই কবি দিলওয়ার আজীবন মানুষকে ভালোবেসে গেছেন ,আর তাঁর নিজেরও সবচে বড় সঞ্চয় ছিলো মানুষের ভালোবাসা । নাম এবং সুনামের যার অন্ত ছিলোনা , খ্যাতির আকাশে যিনি ছিলেন উড়ন্ত ঈগল, তিনি যেকোন মানুষকে মুহুর্তে আপন করে নিতেন । হাজারো সমস্যায় জর্জরিত জীবনে থেকেও তিনি খেয়াল রাখতেন তাঁর পারির্পাশ্বের প্রতি । তাই তার হৃদয়ে উচ্চারিত হয়েছিলো —
জননী একদা তোমারই গর্ভ হতে
নিয়ে আসলাম যে খুনের আশ্বাস
তারি নির্দেশে মৃত্যুর হিম স্রোতে
ঝাপ দিয়ে পড়ে রচিলাম ইতিহাস ।

যে কবির কবিতা আমাদের ইতিহাস এবং ঐতিয্যের ঠিকুজি, সেই গণমানুষের কবি দিলওয়ার ১৯৩৭সালের ১লা জানুয়ারী সিলেটের র্ভাথখলা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন ৭৭বছর বয়েসে ১০অক্টোবর২০১২ তারিখে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরদিনের জন্য এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আজিবন মানুষের জন্য শান্তি অনেষনকারী এই কবির আত্মার শান্তির জন্য আজ আমাদের প্রার্থনা তাঁর স্মৃতির প্রতি অকুন্ঠ শ্রদ্ধা। এই কালোর্ত্তীণ কবি মানসের প্রয়াণ দিবসে আমাদের উচ্চারণ , প্রণাম তোমার জীবনের প্রতীক ,প্রাণের প্রতীক , হে আদিত্য হে জবা কুসুম, তরুণ অরুণ – অভিবাদন তোমায় হে উত্তরণের কবি , সুর্যোদয়ের সূর্য্য বংশের কবি দিলওয়ার।

দিলু নাসের ১০ অক্টোবর লন্ডন

সিলেট প্রতিদিন/এমএনআই-১০


  • 5
    Shares




পুরানো সংবাদ

Mon Tue Wed Thu Fri Sat Sun
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  


© All rights reserved © 2017 sylhetprotidin.com